প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬
বায়ুবিদ্যুতে বড় স্বপ্ন বাংলাদেশের: সম্ভাবনা থাকলেও কেন এই মন্থর গতি?
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই মেটাতে হয় আমদানির মাধ্যমে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের সরবরাহ যেমন কমছে, তেমনি বাড়ছে এর দাম। এমন পরিস্থিতিতে সৌর ও বায়ুশক্তির মতো প্রাকৃতিক উৎসগুলোকে কাজে লাগাতে পারলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রধান উৎস হিসেবে সৌরশক্তিকে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে মোট বিদ্যুতের মাত্র ৩ শতাংশের কম আসে এই খাত থেকে। তবে সৌরশক্তির পাশাপাশি বায়ুবিদ্যুৎ বা উইন্ড পাওয়ারের উন্নয়ন এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।যদিও প্রতিবেশী ভারত বা শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশে বায়ুপ্রবাহের গতি কিছুটা কম, তবুও এই খাতের সম্ভাবনাকে হেলাফেলা করার সুযোগ নেই। বর্তমানে দেশের মোট উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ০.২২ শতাংশ আসে বায়ুবিদ্যুৎ থেকে, যা উন্নয়নের বিশাল সুযোগের ইঙ্গিত দেয়। ২০১৮ সালে ইউএসএইড এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি ল্যাবরেটরির এক যৌথ সমীক্ষায় উঠে এসেছিল যে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৬০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাকে ৩০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং বিশাল সমুদ্র অঞ্চলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কার্যকর উইন্ড টারবাইন স্থাপন করা যেতে পারে। কক্সবাজারের খুরুশকুলে দেশের প্রথম বৃহৎ বাণিজ্যিক বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পটি এরই মধ্যে প্রমাণ করেছে যে, কম বায়ুপ্রবাহের অঞ্চলেও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।আইনি কাঠামোতেও সরকার কিছুটা পরিবর্তন এনেছে, যেখানে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সরাসরি শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে। এই পদক্ষেপকে তৈরি পোশাক খাতের মতো বড় ও রপ্তানিনির্ভর শিল্পের জন্য একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ার ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হবে। তবে এই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নীতিগত পরিবর্তনের কারণে অনেক বড় প্রকল্পের কাজ থমকে গেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও সরকার পরিবর্তনের পর পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া চুক্তিগুলো নতুন করে খতিয়ে দেখার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। ডেনমার্কের একটি প্রতিষ্ঠানের ৫০০ মেগাওয়াটের অফশোর উইন্ড প্রকল্পের কাজও অংশীদারিত্বের পরিবর্তনের কারণে মন্থর হয়ে গিয়েছিল, যদিও এখন তা আবার শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে।বায়ুবিদ্যুৎ খাতের প্রসারে অবকাঠামোগত সমস্যাও এক বড় চ্যালেঞ্জ। ৬০ মিটার লম্বা ব্লেড বা ৯০ মিটার লম্বা বিশাল টাওয়ারগুলো বাংলাদেশের বিদ্যমান সড়কপথ দিয়ে পরিবহন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে প্রকল্প উদ্যোক্তাদের নদী বা সমুদ্রপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা খরচ ও সময় দুটোই বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রে বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য বিশেষায়িত বন্দর ও ভারি যন্ত্রপাতির অভাবও স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল নীতি নির্ধারণ করলেই হবে না, বরং তথ্যগত ঘাটতি দূর করা এবং প্রয়োজনীয় বিমা ও আর্থিক সহায়তার পথ সহজ করা জরুরি। সৌরশক্তি বর্তমানে সস্তা মনে হলেও মধ্যমেয়াদে উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বায়ুবিদ্যুৎ হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ও টেকসই বিকল্প।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল