প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬
ফুটপাতে জিভের তৃপ্তিতেই লুকিয়ে আছে মৃত্যু, ৯০ শতাংশ খাবারই অনিরাপদ
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
প্রচণ্ড দাবদাহ আর অসহনীয় যানজটের ক্লান্তি দূর করতে রাজধানীর ফুটপাতে সাজিয়ে রাখা রঙিন শরবত বা মচমচে চটপটি-ফুচকা পথচারীদের কাছে পরম আরাধ্য। কিন্তু স্বস্তির আড়ালে এই খাবারগুলো যে জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে, তা সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে লোভনীয় এসব স্ট্রিট ফুড এখন 'নীরব ঘাতক' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার প্রতিটি গ্রাসে মিশে আছে কোটি কোটি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া।নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর রাস্তাঘাটে বিক্রি হওয়া খাবারের মান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এমনকি জনপ্রিয় এক প্লেট চটপটিতেও ৭ কোটির বেশি ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা মূলত মানুষের মলমূত্র থেকে ছড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ রাস্তার খাবারই কোনো না কোনোভাবে অনিরাপদ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি এসব খাবার মানুষকে কেবল তাৎক্ষণিক ডায়রিয়ায় আক্রান্ত করছে না, বরং ঠেলে দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল শারীরিক সমস্যার দিকে। অথচ এই বিশাল ‘বিষবাণিজ্য’ নিয়ন্ত্রণে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর তদারকির অভাব প্রকট।বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে স্ট্রিট ফুড বেশ জনপ্রিয় হলেও সেখানে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি লাইসেন্স নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানীর অধিকাংশ ফুটপাতের দোকান গড়ে উঠেছে সরকারি জায়গা দখল করে, যাদের কোনো বৈধ অনুমতি নেই। সরেজমিনে রাজধানীর পল্লবী, মিরপুর বা ফার্মগেটের মতো ব্যস্ত এলাকাগুলোতে দেখা যায়, অপরিচ্ছন্ন বালতির পানিতে বারবার একই প্লেট-চামচ ধোয়া হচ্ছে। রাস্তার ধুলাবালি আর গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া সরাসরি মিশছে ঢাকনাবিহীন খাবারে। এমনকি বিক্রেতারা গ্লাভস ছাড়াই নোংরা হাতে খাবার নাড়াচাড়া করছেন। অনেক ক্ষেত্রে জিলাপি বা শরবতে কাপড়ের সস্তা রং ব্যবহার করা হচ্ছে এবং একই তেল দিনের পর দিন পুড়িয়ে খাবার ভাজা হচ্ছে, যা শরীরে মারাত্মক ট্রান্সফ্যাট তৈরি করে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং বিক্রেতাদের ন্যূনতম স্বাস্থ্য সচেতনতা না থাকা। ওয়াসার সরবরাহ করা পানি সরাসরি ব্যবহার করার ফলে মলমূত্রের জীবাণু সহজেই খাদ্যে মিশে যাচ্ছে। এছাড়া মাছ সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক বরফ ব্যবহার করা হচ্ছে পানীয় তৈরিতে, যা খাওয়ার জন্য একেবারেই অনুপযোগী। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করছে এবং পুরো জাতির ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।যদিও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা বলছে, কিন্তু নিজস্ব ল্যাবরেটরি ও জনবল সংকটের কারণে কার্যক্রম আশানুরূপ গতি পাচ্ছে না। কঠোর আইন থাকলেও এর সঠিক প্রয়োগ না থাকায় বিক্রেতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এক চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই এখনই কার্যকর তদারকি এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল