প্রিন্ট এর তারিখ : ০৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬
ইরানের শান্তি প্রস্তাব বনাম ট্রাম্পের রণকৌশল যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিস্ফোরক যুক্তি
শামিমা লিয়া, আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর ||
ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাত বজায় রাখতে মার্কিন কংগ্রেসের কোনো ধরনের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সাবেক প্রেসিডেন্টই অতীতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনসভার তোয়াক্কা করেননি। বিবিসি’র এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রাক্কালে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, কংগ্রেসের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার বিষয়টি তার পূর্বসূরিদের অনেকেই ‘সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক’ বলে মনে করতেন। ট্রাম্পের দাবি, অনেক প্রেসিডেন্টই অতীতে এই সীমা অতিক্রম করেছেন এবং বাস্তবে এই আইন কখনোই কেউ যথাযথভাবে প্রয়োগ করেনি বা মেনে চলেনি।তবে ট্রাম্পের এই অবস্থানের পেছনে থাকা আইনি সমীকরণটি বেশ জটিল। ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ার রেজ্যুলেশন’ অনুযায়ী, কোনো প্রেসিডেন্ট সামরিক অভিযান শুরু করলে এবং সে বিষয়ে কংগ্রেসকে অবহিত করলে, তার পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে অভিযান বন্ধ করতে তিনি আইনত বাধ্য, যদি না কংগ্রেস সেই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট অনুমোদন দেয়। মূলত রিচার্ড নিক্সনের ভিয়েতনাম যুদ্ধের ক্ষমতা সীমিত করার লক্ষ্যেই এই আইনটি পাস করা হয়েছিল। ইরানের ওপর মার্কিন হামলার বিষয়টি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল, যার প্রেক্ষিতে গত শুক্রবারই সেই নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা পূর্ণ হয়েছে। অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করছেন যে, বর্তমানে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকায় এই সময়সীমার গণনা সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে। এটি নিয়ে এখন বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে যে, যুদ্ধবিরতি চলাকালীন সময় কি আদৌ এই ৬০ দিনের অন্তর্ভুক্ত হবে কি না।ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী অনেক প্রেসিডেন্টই যুদ্ধের জন্য কংগ্রেসের দ্বারস্থ হয়েছেন। ১৯৮৩ সালে রোনাল্ড রিগ্যান লেবাননে সেনা মোতায়েনের আগে এবং ১৯৯১ সালে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ উপসাগরীয় যুদ্ধের আগে কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়েছিলেন। এমনকি আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের ক্ষেত্রেও জর্জ ডব্লিউ বুশ আইনসভার সবুজ সংকেত নিয়েছিলেন। তবে এর ব্যতিক্রমও কম নয়। ১৯৯৯ সালে বিল ক্লিনটন কসোভোতে ৭৮ দিনব্যাপী বোমা হামলা চালিয়েছিলেন এবং ২০১১ সালে বারাক ওবামা লিবিয়ায় সামরিক অভিযান জারি রেখেছিলেন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই। এই বিতর্ক প্রসঙ্গে মিনেসোটার হ্যামলাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভ শুল্টজ মত প্রকাশ করেছেন যে, আগের প্রেসিডেন্টরা আইন লঙ্ঘন করেছেন মানেই তা বর্তমানের জন্য সঠিক হয়ে যায় না। তার মতে, ট্রাম্প কার্যত কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা মার্কিন সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী।বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তার শেষ কোথায় তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। ট্রাম্প বারবার আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন যে, ইরানের সাথে এই সংঘাত ভিয়েতনাম বা ইরাক যুদ্ধের মতো দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং এটি অনেক ছোট পরিসরের। তবে বিশ্লেষকদের শঙ্কা ভিন্ন। ২০১৪ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সেই বিখ্যাত উক্তি—‘যুদ্ধ শুরু করার চেয়ে শেষ করা অনেক বেশি কঠিন’—এখন যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কূটনৈতিক ও সামরিক এই টানাপোড়েনের মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।সূত্র: বিবিসি
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল