প্রিন্ট এর তারিখ : ০৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬
মার্কিন রণতরীর জন্য যমদূত সমুদ্রে ঘাতক ডলফিন নামাচ্ছে ইরান, আতঙ্কে পেন্টাগন
শামিমা লিয়া, আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর ||
হরমুজ প্রণালীর নীল জলরাশিতে এখন কেবল ঢেউয়ের গর্জন নয়, বরং ঘনীভূত হচ্ছে এক অদ্ভুত ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক সংঘাতের কালো মেঘ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন নৌ-অবরোধে কোণঠাসা ইরান এখন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোকাবিলায় ‘মাইনবাহী ডলফিন’ ব্যবহারের মতো অপ্রচলিত ও বিচিত্র এক রণকৌশল গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। স্নায়ুযুদ্ধ আমলের এই ঘাতক ডলফিন ব্যবহারের পরিকল্পনাটি তেহরানের কট্টরপন্থীদের আলোচনায় উঠে আসায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে।ইরানের এই ডলফিন বাহিনীর ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ এবং একই সাথে আতঙ্কজনক। ২০০০ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে কেনা একটি সাবেক সোভিয়েত সামরিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে এগুলো তেহরানের হস্তগত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর তাদের ডলফিন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি ইউক্রেনের অধীনে চলে গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে সব সরঞ্জামসহ ইরানের কাছে বিক্রি করা হয়। প্রশিক্ষিত এই ডলফিনগুলোকে শত্রুপক্ষের ডুবুরিদের হার্পুন দিয়ে আক্রমণ করা, পিঠে বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড ইনজেকশন বহন করা এবং জাহাজের গায়ে ধাক্কা খেয়ে বিস্ফোরণ ঘটানোর মতো ভয়ংকর সব আত্মঘাতী বা ‘কামিকাজে’ মিশনে দক্ষ করে তোলা হয়েছিল। যদিও বর্তমানে এই প্রাণীগুলো ঠিক কী অবস্থায় আছে তা অস্পষ্ট, তবুও বর্তমান সংকটে ইরান এগুলোকে ‘অপ্রচলিত অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের হুমকি দিয়ে ওয়াশিংটনকে চাপে ফেলার চেষ্টা করছে।মার্কিন অবরোধের ফলে ইরানের তেল রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটির অর্থনীতিতে চরম ধস নেমেছে। এই সংকট মোকাবিলায় তেহরানের ভেতরে দুটি স্পষ্ট ধারা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থীরা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইলেও সাইদ জলিলির নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থীরা সামরিক পদক্ষেপের পক্ষপাতী। তাদের মতে, নিষ্ক্রিয়ভাবে ধ্বংস হওয়ার চেয়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর পাল্টা চাপ তৈরি করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং প্রচুর পরিমাণ এলএনজি এই সরু হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চলা উত্তেজনায় এই পথে জাহাজ চলাচল এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। ইরান কেবল ডলফিন ব্যবহারের হুমকিই দেয়নি, বরং লোহিত সাগরের তলদেশের গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট কেবল কেটে দেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়ে রেখেছে, যা পুরো বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিতে পারে।ওয়াশিংটনও ইরানের এই বিচিত্র হুমকিকে মোটেও হালকাভাবে নিচ্ছে না। মার্কিন নৌবাহিনী ইতিমধ্যেই তাদের নিজস্ব প্রশিক্ষিত ডলফিন, সমুদ্রতলে নজরদারি করা বিশেষ ড্রোন এবং আধুনিক মাইন-সুইপিং হেলিকপ্টার ওই অঞ্চলে মোতায়েন করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন, মাইন স্থাপনের চেষ্টা করা যেকোনো ইরানি নৌযান যেন দেখা মাত্রই ধ্বংস করা হয়। অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান সতর্ক করেছেন যে, এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং তেলের দাম বৃদ্ধি বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে। তেহরান অবরোধ প্রত্যাহারের শর্তে হামলা বন্ধের প্রস্তাব দিলেও পরমাণু ইস্যুতে ট্রাম্পের অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের এই জলপথে যুদ্ধের দামামাকে আরও তীব্র করে তুলছে।তথ্যসূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল