প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬
স্বপ্নের খনিই এখন বিষাক্ত আতঙ্ক: শিশুদের রক্তেও মিলল সিসা
ইয়াসরির মাহবুব, স্টাফ রিপোর্টার ||
মধ্য বসনিয়ার এক সময়ের প্রাণোচ্ছ্বল শহর ভারেস এখন এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক দশকের দীর্ঘ অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে রূপা ও সিসার খনিকে কেন্দ্র করে এই জনপদের মানুষ যে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিল, তা এখন বিষাক্ত আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। গত বছর খনিটি চালু হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের এক নতুন উদ্দীপনা তৈরি হলেও, অতি সম্প্রতি পরিচালিত এক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উঠে এসেছে শিউরে ওঠার মতো তথ্য। শহরটির তিন শতাধিক বাসিন্দার রক্তে উচ্চমাত্রার বিষাক্ত সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা এই খনি এলাকার ভবিষ্যৎকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।তদন্তে জানা গেছে, খনির আকরিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের কাছাকাছি বসবাসকারী বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৭ জনের শরীরে সিসার মাত্রা এতটাই বেশি যে তা চিকিৎসকদের ভাষায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, ছোট শিশুদের রক্তেও এই বিষাক্ত ধাতুর উপস্থিতি মিলেছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি তাদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে, যা একটি পুরো প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সময় বুধবার বসনিয়ার চারটি প্রভাবশালী পরিবেশবাদী সংস্থা কানাডিয়ান খনি কোম্পানি ‘ডান্ডি প্রেশাস মেটালস’ (ডিপিএম)-এর বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেছে। পরিবেশ আইন বিশেষজ্ঞদের দাবি, নাগরিকদের মৌলিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে খনি কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন চরম অবহেলার পরিচয় দিয়েছে।অভিযুক্ত কোম্পানি ডিপিএম ঘটনার ভয়াবহতা স্বীকার করলেও এই বিষক্রিয়ার জন্য সরাসরি নিজেদের দায় নিতে এখনো নারাজ। কোম্পানিটি দাবি করছে যে তারা শুরু থেকেই পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তারা ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের রক্ত পরীক্ষার খরচ বহন এবং এলাকার মাটি ও পানির গুণাগুণ নতুন করে পরীক্ষা করার কাজ শুরু করেছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে, ভারেস এলাকাটি ঐতিহাসিকভাবেই খনি সমৃদ্ধ অঞ্চল, তাই বর্তমান বিষক্রিয়া আধুনিক খনি কার্যক্রমের ফল নাকি পূর্বের কোনো পুরনো খনি প্রকল্পের জের, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। তবে খনি কর্তৃপক্ষের এমন দায়সারা বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারছে না স্থানীয় বাসিন্দারা।বর্তমানে ভারেসের সাধারণ পরিবারগুলো এক চরম দিশেহারা পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যারা মূলত কৃষিকাজ ও গবাদি পশুর ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারা এখন নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। শাকসবজি ও ফসলি জমিতে সিসার কণা ছড়িয়ে পড়ায় অনেক জায়গায় চাষবাস বন্ধ হয়ে গেছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন করে আঘাত হেনেছে। বসনিয়ার ফেডারেল সরকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ইতোমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নেরমিন নিকশিচ এক কড়া বার্তায় জানিয়েছেন যে, কোনো বড় বিনিয়োগ বা ব্যবসায়িক স্বার্থের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যকে বিপন্ন হতে দেওয়া হবে না। আদালত মামলাটি গ্রহণ করলে খনিটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম এবং শহরের পরিবেশ রক্ষায় কোনো কঠোর বিধিনিষেধ বা আইনি সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল