প্রিন্ট এর তারিখ : ০৯ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ মে ২০২৬
স্মৃতির জানালায় রঙিন পৃথিবী হারানো শৈশবের সেই ‘বায়স্কোপ’
ইয়াকুব মাসুম ||
মেলা প্রাঙ্গণে ধুলো উড়ছে, বাতাসে খই-বাতাসার মিষ্টি গন্ধ। এর মাঝেই এক কোণ থেকে ভেসে আসছে ছন্দময় টুংটাং শব্দ আর এক জাদুকরী হাঁক— "কী চমৎকার দেখা গেল! ওই দেখেন ভাই বদ্রীনাথের মন্দির, এইবার দেখেন সিনেমার নায়ক-নায়িকা!" ভিড় ঠেলে উঁকি দিলেই চোখে পড়ে রঙিন নকশা করা একটি কাঠের বাক্স। জাদুর সিন্দুক বললেও ভুল হবে না। এর নাম— বায়স্কোপ।আধুনিক স্মার্টফোন বা থ্রি-ডি সিনেমার যুগে এটি হয়তো এক প্রাচীন কঙ্কাল, কিন্তু এক সময় এটিই ছিল বাঙালির ‘পকেট-সিনেমা’ আর বিশ্বভ্রমণের একমাত্র জানালা। বায়স্কোপের ম্যাজিকটা আসলে তার লেন্সের ওপারে। ছোট ছোট গোল ছিদ্রে চোখ রাখলেই অন্ধকার ঘরে যেন আলো জ্বলে ওঠে। কাঁচের ওপারে একের পর এক পাল্টে যায় স্থির ছবি— মক্কা শরিফের গম্বুজ থেকে তাজমহলের মার্বেল পাথর, সুন্দরবনের বাঘ থেকে রুপালি পর্দার কিংবদন্তিদের হাসি।সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো বায়স্কোপওয়ালার সেই ‘লাইভ ধারাভাষ্য’। হাতে খঞ্জনি বাজিয়ে সুর করে তিনি যখন বর্ণনা দেন, তখন স্থির ছবিগুলোও যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। লেন্সের ওপর চোখ রাখা শিশুদের মনে হয়, তারা বুঝি সত্যি সত্যিই উড়াল দিয়েছে সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে। বায়স্কোপওয়ালার সেই চিরাচরিত ছন্দ আজও মানুষের কানে বাজে:"দেখিয়া যান চমৎকার, দশ পয়সায় সব সাবাড়!বসে আছেন যারা, মিস করছেন তারা..."আজকের নেটফ্লিক্স আর ইউটিউবের হাই-ডেফিনিশন যুগে বায়স্কোপ প্রায় নির্বাসিত। এখনকার শিশুরা হাতের মুঠোয় সারা বিশ্বকে পায়, কিন্তু সেই কাঠের বাক্সে চোখ রাখার যে ‘অপেক্ষা’ আর ‘বিস্ময়’, তা হয়তো কোথাও হারিয়ে গেছে। বায়স্কোপ কেবল বিনোদন ছিল না, এটি ছিল একটি সামাজিক মিলনমেলা। কয়েক জোড়া শিশু একসাথে বাক্সে চোখ রাখত, আর তাদের সমস্বরে ওঠা বিস্ময়সূচক শব্দে মুখরিত হতো গ্রামবাংলার বিকেলগুলো। এটি ছিল মেঠো পথের এক ভ্রাম্যমাণ তথ্যচিত্র, যা সাধারণ মানুষের কাছে দেশ-বিদেশের সৌন্দর্য পৌঁছে দিত।একুশ শতকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর হাই-ডেফিনিশন স্ক্রিনের ভিড়েও বায়স্কোপের আবেদন আজও অমলিন। কারণ এটি কেবল একটি যন্ত্র নয়, বরং যান্ত্রিকতাহীন এক বিশুদ্ধ জাদু। এর অনন্যতার মূল রহস্য হলো এর বিস্ময়কর কারিগরি শৈলী; যেখানে কোনো বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেটের সংযোগ ছাড়াই কেবল হাতের ছোঁয়ায় চাকা ঘুরিয়ে আর সুরের মূর্ছনায় তৈরি করা হতো এক অভাবনীয় আবহ। এই মাটির সুবাস মাখা বিনোদনটি একইসাথে আমাদের লোকজ শিল্পের এক জীবন্ত ক্যানভাস। তবে বায়স্কোপের আসল সার্থকতা এর কল্পনার জগতে—এটি দর্শককে কেবল ছবি দেখাত না, বরং জাদুকরী বয়ানে প্রতিটি ছবিকে জীবন্ত করে তুলে মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শেখাত।বাংলার এই হারানো শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখা কেবল সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং আমাদের শিকড়কে চেনার পথ। স্মার্টফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে একবার সেই ধুলোমাখা লেন্সের গভীরে তাকিয়ে দেখুন— সেখানে আজও বেঁচে আছে আমাদের ফেলে আসা রঙিন শৈশব, আমাদের প্রাণের বাংলা।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল