প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬
রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে বৈপরীত্য, সোনালীর বড় মুনাফা আর জনতার বিশাল লোকসান
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
একসময় দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। বড় বড় শিল্পকারখানা, অবকাঠামো ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পেছনে এসব ব্যাংকের অর্থায়নের বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনিয়ম, দুর্নীতি, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক খাত এখন গভীর সংকটে পড়েছে। সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চার রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ভিন্নধর্মী চিত্র—একদিকে বড় মুনাফা করেছে সোনালী ব্যাংক, অন্যদিকে রেকর্ড পরিমাণ লোকসানে ডুবে গেছে জনতা ব্যাংক।২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। ব্যাংকটি গত বছরের শেষে ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৯৮৮ কোটি টাকা। দেশের সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকের মধ্যে মুনাফার দিক থেকে বর্তমানে তৃতীয় স্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। তালিকার শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক।বিশ্লেষকদের মতে, বড় শিল্পঋণ থেকে দূরে থেকে তুলনামূলক নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করাই সোনালী ব্যাংকের সাফল্যের অন্যতম কারণ। ব্যাংকটির বড় একটি অংশের অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে, যেখান থেকে স্থিতিশীল মুনাফা এসেছে। পাশাপাশি এসএমই ও ভোক্তা খাতে ঋণ বিতরণ বাড়ানোয় খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও তুলনামূলক কম ছিল।সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ বড় ঋণের পরিবর্তে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং ভোক্তা খাতে গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই ব্যাংকটি স্থিতিশীল অবস্থানে থাকতে পেরেছে। তিনি বলেন, সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ থেকেও ভালো আয় হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো ফল আসবে বলে তারা আশাবাদী।অন্যদিকে দেশের অন্যতম বড় রাষ্ট্রীয় ব্যাংক জনতা ব্যাংক বর্তমানে ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের শেষে ব্যাংকটির লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকায়, যা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে রেকর্ড পর্যায়ের ক্ষতি। ২০২৪ সালে এই লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা।ব্যাংকটির সংকটের মূল কারণ বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ। বর্তমানে জনতা ব্যাংকের প্রায় ৭০ শতাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে পড়েছে। বড় খেলাপিদের তালিকায় রয়েছে বেক্সিমকো, এস আলম গ্রুপ, এননটেক্স, ক্রিসেন্ট গ্রুপ এবং আরও কয়েকটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকটির সুদ আয় কমে গেছে, অথচ আমানতকারীদের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে ব্যয় বেড়েই চলেছে। ফলে পরিচালন কার্যক্রম থেকেই বড় অঙ্কের ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্যাংকটি।জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান বলেন, বড় ঋণগ্রহীতাদের অধিকাংশই এখন খেলাপি। অনেকের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও কার্যকর আদায় সম্ভব হচ্ছে না। কেউ কারাগারে, কেউ আবার দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তিনি জানান, ব্যাংকটি এখন আমানত বাড়ানো এবং বিনিয়োগ থেকে আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।অগ্রণী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংকের চিত্রও খুব বেশি স্বস্তিদায়ক নয়। কাগজে-কলমে এই দুই ব্যাংক মুনাফা দেখালেও বাস্তবে বড় ধরনের মূলধন ও নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতিতে রয়েছে। অগ্রণী ব্যাংক ২০২৪ সালে প্রায় ৯২৫ কোটি টাকা লোকসান করলেও বিশেষ সুবিধার কারণে ২০২৫ সালের শেষে ৫৮ কোটি টাকা মুনাফা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। ব্যাংকটির প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এই ঘাটতি পূরণ করার পরই প্রকৃত মুনাফা হিসাব হওয়ার কথা।একইভাবে রূপালী ব্যাংকও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ছাড় নিয়ে সামান্য মুনাফা দেখিয়েছে। যদিও ব্যাংকটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। খেলাপি ঋণের চাপ এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বর্তমান সংকট শুধু আর্থিক নয়, বরং এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বছরের পর বছর রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং অনিয়মিত ঋণ বিতরণের কারণে এসব ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংক যদিও বিশেষ ছাড় ও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু বিশেষ সুবিধা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, কঠোর ঋণ তদারকি এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল