প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬
৩ লাখ কোটি টাকার মেগা উন্নয়ন বাজেট আসছে বড় প্রকল্পের ঘোষণা
ইয়াসরির মাহবুব, স্টাফ রিপোর্টার ||
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বিশাল উন্নয়ন বাজেটের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তাবিত এই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। শনিবার অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় এডিপির খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। আগামী ১৬ মে খাতভিত্তিক বরাদ্দ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের এডিপির মোট আকার ধরা হয়েছে তিন লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন বা জিওবি ফান্ড থেকে ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। আর বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে আরও প্রায় ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে। সব মিলিয়ে মোট উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে তিন লাখ আট হাজার ৯২৪ কোটি টাকার বেশি।এবারের উন্নয়ন বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে ‘থোক বরাদ্দ’ বা অনির্দিষ্ট খাতে বরাদ্দের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। পরিকল্পনা কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট খাতে প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ মোট এডিপির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অর্থ এখনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের আওতায় আনা হয়নি। এই বিশাল অনির্দিষ্ট বরাদ্দ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে ইতোমধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ ভবিষ্যতে অর্থের অপচয় বা অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ নির্দিষ্ট প্রকল্প ছাড়া বরাদ্দ দেওয়া হলে পরে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় সেই অর্থ ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়।তবে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েই এই বড় এডিপি প্রণয়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি), ডেল্টা প্ল্যান, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) এবং গ্রিন ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্প নির্বাচন করা হচ্ছে।খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরিবহন ও যোগাযোগ খাত এবারও সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির প্রায় ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে শিক্ষা খাত, যেখানে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এই বিভাগ পাচ্ছে ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ বিভাগও বড় অঙ্কের বরাদ্দ পাচ্ছে।স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও এখানেও থোক বরাদ্দের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে স্বাস্থ্য বিভাগের চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার ৮ কোটি টাকা, অথচ একই খাতে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। একইভাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ ৫ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি হলেও থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলতি অর্থবছরেই এডিপি বাস্তবায়নের হার আশানুরূপ নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বাস্তবায়ন হার হয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশের কিছু বেশি। এমন বাস্তবতায় আগামী বছরে আরও বড় উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন করা প্রশাসনিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশিদ মনে করেন, এডিপির আকার বড় করলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, একই প্রশাসনিক কাঠামো ও জনবল দিয়ে এত বড় উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।পরিকল্পনা কমিশনের কার্যপত্র অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের এডিপিতে মোট ১ হাজার ১২১টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪৯টি বিনিয়োগ প্রকল্প, ১০৭টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং ৪৩টি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্প রয়েছে। এছাড়া নতুন করে আরও ১ হাজার ২৭৭টি অননুমোদিত প্রকল্প তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো পর্যায়ক্রমে অনুমোদনের জন্য বিবেচনা করা হবে।সরকার আগামী জুনের মধ্যে ২২৩টি প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে। এনইসি থেকে এসব প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও এত বড় উন্নয়ন বাজেট উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই বিশাল উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল