প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬
গ্রিসের নতুন সাংবিধানিক পরিকল্পনা যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় যুগান্তকারী এক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে ইউরোপের দেশ গ্রিস। প্রযুক্তির এই নতুন বাস্তবতায় মানবাধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সুরক্ষিত রাখতে দেশটি এবার সংবিধানেই এআই-সংক্রান্ত বিশেষ ধারা যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। গ্রিস সরকার মনে করছে, প্রযুক্তি যেন কোনোভাবেই মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে এবং সবসময় মানবকল্যাণ ও সামাজিক সেবার জন্য কাজ করে— তা নিশ্চিত করতেই সাংবিধানিক সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংশোধনীগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন। গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত গ্রিস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে এই উদ্যোগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে।প্রধানমন্ত্রী মিতসোতাকিস বলেন, বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তি দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং এটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মানবজাতির জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তাই আগামী দিনের পৃথিবীকে আরও নিরাপদ করতে এখন থেকেই সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করা জরুরি। তিনি নিজের দলের আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে বলেন, “আমরা এমন এক ভবিষ্যতের জন্য কাজ করছি, যেখানে আমাদের সন্তানরা প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করবে, তবে তার শিকার হবে না।”প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এমন একটি ধারা যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে, যেখানে এআইকে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক কল্যাণের সেবায় নিয়োজিত থাকার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হবে। সরকার আশা করছে, এই সাংবিধানিক সুরক্ষা ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করবে এবং এর ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করবে।শুধু এআই নয়, গ্রিসের সংবিধানে আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডাকযোগে ভোটদানের সুযোগ সম্প্রসারণ, বাধ্যতামূলক শিক্ষার মেয়াদ নয় বছর থেকে বাড়িয়ে ১১ বছর করা এবং ভূতাপেক্ষ কর ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করা। ভূতাপেক্ষ কর ব্যবস্থা হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে সরকার নতুন কর আইন অতীতের কোনো নির্দিষ্ট সময় থেকে কার্যকর করতে পারে।মিতসোতাকিস বলেন, বর্তমানে বিশ্ব জলবায়ু সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা, পানিসম্পদ সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক কাঠামোকে আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।সংবিধান সংশোধনের এই প্রক্রিয়া গ্রিসে বেশ জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদী। এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য পরপর দুটি সংসদে ভোটের প্রয়োজন হয় এবং সাধারণত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছাড়া তা সম্ভব হয় না। তবুও সরকার বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গুরুত্ব দিচ্ছে।বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রিস প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে দ্রুত এগিয়েছে। আট বছর আগে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার পর দেশটি প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে জোর দেয়। এরই অংশ হিসেবে সীমান্ত নজরদারি ব্যবস্থা উন্নত করা হয়েছে, কর প্রশাসন ডিজিটাল করা হয়েছে এবং সরকারি সেবাগুলো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হয়েছে।বর্তমানে গ্রিসের ডিজিটাল সরকারি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নাগরিকরা বিয়েবিচ্ছেদ আবেদন থেকে শুরু করে ফুটবল ম্যাচের টিকিট কেনা পর্যন্ত নানা কাজ সম্পন্ন করতে পারছেন। এছাড়া গত মাসে দেশটির সরকার ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর সীমাবদ্ধতার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর একই ধরনের নীতি গ্রহণে চাপ সৃষ্টি করার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।দেশটির সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর হাতে বিপুল তথ্য ও নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে, যা সাধারণ জনগণের তদারকির বাইরে। তাই এআইকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের সেবায় বাধ্য করতে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।সরকারের প্রধান আইনপ্রণেতা এভরিপিডিস স্টাইলিয়ানিডিস বলেছেন, এই সংশোধনীগুলো ভবিষ্যতে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক ব্যবহার এখন মানবাধিকারের প্রতিটি ক্ষেত্রের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে, ফলে এটি আর শুধু প্রযুক্তিগত ইস্যু নয়; বরং সাংবিধানিক ও নৈতিক প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল