প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬
বিএসএফের গুলির পর নিস্তব্ধ তিন গ্রাম, ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
সীমান্তঘেঁষা জনপদগুলোতে দারিদ্র্য আর প্রলোভন কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে এক অন্ধকার চোরাবালির দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তার এক করুণ প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার গ্রামগুলোতে। গত শুক্রবার গভীর রাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন কসবার ধ্বজনগর গ্রামের কলেজছাত্র মোরছালিন এবং মানিক্যমুড়ি গ্রামের নবীর হোসেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে শোকের মাতম আর চাপা ক্ষোভে ফেটে পড়ছে স্থানীয় বাসিন্দারা। নিহতদের মরদেহ দাফন করা হলেও সীমান্ত এলাকার এই মৃত্যু মিছিল কেন থামছে না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখন অনেক প্রশ্ন।নিহত মোরছালিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ঘরের দরজায় বসে ছোট ছেলের কবরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন বাবা হেবজু মিয়া। মোরছালিনের সহপাঠী হৃদয় ও জাহিদ যখন বন্ধুর কবর জিয়ারত করতে আসেন, তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। শোকার্ত বাবা আক্ষেপ করে বলছিলেন, পাশের বাড়ির প্রভাবশালীরা কীভাবে তার সহজ-সরল ছেলেকে আঁধারে ডেকে নিয়ে কুপথে ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে ৫৫ বছর বয়সী নবীর হোসেনের ৯০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা জাহেরা বেগম কেবল বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন, কেন ছেলের আগে তার মৃত্যু হলো না। এই বয়সে একমাত্র উপার্জনকামী সন্তানকে হারিয়ে তিনি এখন দিশেহারা।ধ্বজনগর গ্রামের সাইফুল মিয়ার স্ত্রী রিনা বেগমের কণ্ঠে ঝরছিল তীব্র ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব। তিনি সরাসরি অভিযোগ তুলছেন চোরাকারবারিদের সিন্ডিকেট এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাফিলতির দিকে। তার মতে, বড় বড় চোরাকারবারিরা গ্রামের অল্পবয়সী ছেলেদের কয়েকশ টাকার লোভ দেখিয়ে সীমান্তের ওপারে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। অথচ নেপথ্যের নায়করা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশ, বিজিবি কিংবা বিএসএফ—সবার পরোক্ষ প্রশ্রয়েই এই চোরাচালান চক্রগুলো সক্রিয় থাকে। প্রশ্ন উঠেছে, যদি সবাই মিলেই সুযোগ করে দেয়, তবে কেন বারবার সাধারণ মানুষের বুকেই গুলি চালানো হয়?সীমান্ত সংলগ্ন ধ্বজনগর, পাথরিয়াদ্বার এবং মানিক্যমুড়ি গ্রামগুলোতে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, ওই রাতে বিএসএফের গুলিতে আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। কিন্তু আইনি জটিলতা আর গ্রেফতারের ভয়ে তারা প্রকাশ্যে চিকিৎসা না নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে আত্মগোপনে রয়েছেন। পাথরিয়াদ্বার গ্রামের নেহারা বেগম জানান, তার ছেলে জুবায়ের হোসেন বাবুও ওই রাতে আহত হয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন, কিন্তু ছেলের কোনো হদিস তিনি পাচ্ছেন না। একই অবস্থা গুলিবিদ্ধ বাহার উদ্দিনের স্ত্রী মোমেনা বেগমেরও; স্বামী কোথায় চিকিৎসাধীন আছেন তা তারও জানা নেই। সামান্য ৫০০-৭০০ টাকার বিনিময়ে জীবন বাজি রেখে রাতের আঁধারে মালপত্র টানতে গিয়ে আজ অনেক পরিবার নিঃস্ব হতে বসেছে।স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ওই রাতে অন্তত ৩৫-৪০ জনের একটি দল মাছের পোনা আনতে সীমান্ত অতিক্রম করেছিল। তাদের মধ্যে দুজনের প্রাণ গেলেও বাকিদের অধিকাংশই নিখোঁজ বা আত্মগোপনে রয়েছেন। এদিকে ঘটনার পর তৎপরতা বাড়িয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। গোপীনাথপুর ইউনিয়ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মালু মিয়া ও মনির হোসেন নামে দুই চোরাকারবারিকে আটক করেছে পুলিশ। কসবা থানার ওসি নাজনীন সুলতানা জানিয়েছেন, সীমান্তে অবৈধ কার্যক্রম রোধে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, কেবল মাঠপর্যায়ের কুলি বা শ্রমিকদের ধরলে এই সংকটের সমাধান হবে না, বরং নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের নির্মূল করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল