প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬
ইরানের বাজারে আগুন! রেকর্ড দামে বিক্রি হচ্ছে খাবার, অস্তিত্ব সংকটে সাধারণ মানুষ
শামিমা লিয়া, আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর ||
একদিকে সীমান্তের ওপারে যুদ্ধের দামামা, আর অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবন এখন ওষ্ঠাগত। দেশটির সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে রেকর্ড পরিমাণ মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত প্রশমনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, কূটনীতির চেয়েও সাধারণ মানুষের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুবেলা দুমুঠো খাবারের সংস্থান করা।গত রবিবার সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বর্তমান পরিস্থিতির নাজুকতা স্বীকার করে নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি দেশবাসীকে বাস্তবসম্মতভাবে বর্তমান সীমাবদ্ধতাগুলো বোঝার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সামনে অনেক কঠিন সমস্যা আসবে যা কেবল জাতীয় ঐক্য ও সংহতির মাধ্যমেই মোকাবিলা করা সম্ভব। তবে সরকারি আশ্বাসে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কমছে না। ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের (এসসিআই) তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মুদ্রাস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৩.৫ শতাংশে। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে খাদ্যপণ্যের বাজারে; গত বছরের তুলনায় এ বছর খাদ্যপণ্যের দাম গড়ে বেড়েছে ১১৫ শতাংশ। তেহরানের স্থানীয় বাসিন্দারা আক্ষেপ করে বলছেন, মাসের শুরুতে যে পণ্য কেনার সামর্থ্য ছিল, মাসের শেষে তা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। স্বল্প আয়ের মানুষের বেতনের সিংহভাগই এখন ব্যয় হচ্ছে কেবল চাল ও ডালের মতো ন্যূনতম নিত্যপণ্য কিনতে।অর্থনৈতিক এই ধসের মূলে রয়েছে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের নজিরবিহীন অবমূল্যায়ন। গত এক বছরে এক ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান ৮ লাখ ৩০ হাজার থেকে তলানিতে ঠেকে এখন ১৭ লাখ ৭০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। মুদ্রার এই পতন আমদানিনির্ভর পণ্যের বাজারে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ ৭২ দিনের একটানা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট। সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র দোহাই দেওয়া হলেও, দেশটির স্টার্টআপ এবং অনলাইনভিত্তিক ব্যবসাগুলো এখন ধ্বংসের মুখে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে, যা সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নগদ অর্থ সহায়তা ও ডিজিটাল ভাউচারের মাধ্যমে কুপন প্রথা চালু করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। মাথাপিছু ১০ ডলারেরও কম এই সহায়তা দিয়ে বর্তমান আকাশচুম্বী বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তীব্র বাজেট ঘাটতির কারণে এই ভর্তুকি বাড়ানোর সুযোগও সরকারের হাতে নেই। এদিকে সরকারের কট্টরপন্থী নেতারা এই মূল্যবৃদ্ধিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক প্রতিশোধ’ হিসেবে দেখলেও সাধারণ মানুষ প্রশাসনের ব্যবস্থাপনার দিকেই আঙুল তুলছে। মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে বিদেশের সঙ্গে ইরানের বৈধ বাণিজ্য প্রায় অচল হয়ে পড়ায় দেশটি এখন এক গভীর মানবিক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল