প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬
হামের সংক্রমণ রোধে কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের আহ্বান বিশেষজ্ঞদের
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রথাগত হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসার চেয়ে তৃণমূল পর্যায়ের বা সম্প্রদায়ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবাকে মূল কেন্দ্রে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ওষুধ বা চিকিৎসার মাধ্যমে এই সংক্রমণ রোধ সম্ভব নয়; বরং টিকাদান, পুষ্টির উন্নয়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে রোগতাত্ত্বিক নজরদারির একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। তারা মনে করেন, সঠিক সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই প্রাদুর্ভাব দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।বিশিষ্ট মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া এই পরিস্থিতিতে সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁর মতে, গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায় কর্মরত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরাই হচ্ছেন দেশের জনস্বাস্থ্যের প্রধান রক্ষাকবচ। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন যে, স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো কেবল বর্তমানের হামের সংক্রমণই ঠেকাবে না, বরং ভবিষ্যতে যেকোনো বড় ধরণের স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে। তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে সঠিক নীতিনির্ধারণ এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণই সংক্রমণের এই শৃঙ্খল ভাঙার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন। বিশেষ করে দেশের দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।স্বাস্থ্য খাতের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা, যেমন স্বাস্থ্য সহকারী এবং পরিবার কল্যাণ কর্মীরা বর্তমানে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত করা, লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ এবং কেন্দ্রীয়ভাবে সেই তথ্য পাঠানোর মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, মাতৃকালীন অপুষ্টি, কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়া এবং সঠিক শিশুখাদ্য অভ্যাসের অভাবের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো শিশুদের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এই কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগেই হামের মতো সংক্রামক ব্যাধিগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা এই দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।টিকাদান কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা নিয়ে সরকারি তথ্যে জানানো হয়েছে যে, চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে এক কোটি আশি লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে দেশব্যাপী একটি বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযান শুরু হয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় দেশের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলাগুলো থেকে এই কার্যক্রম শুরু হয়ে এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ছিয়ানব্বই শতাংশের বেশি শিশুকে এই টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। সংক্রমণের মূল কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূলত বিগত করোনা অতিমারির সময়ে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে যে বড় ধরণের ব্যাঘাত ঘটেছিল, তার পরিণাম হিসেবেই বর্তমানের এই অস্থিরতা। সে সময় চলাচলে বিধিনিষেধ, টিকার সরবরাহ সংকট এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে টিকা নিয়ে তৈরি হওয়া অহেতুক ভীতি অনেক শিশুকে তাদের নিয়মিত ডোজ থেকে বঞ্চিত করেছে।চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ যা একজন আক্রান্ত শিশু থেকে অন্তত আঠারো জন সুস্থ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। শিশু রোগ ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বেগম শরীফুন নাহার সতর্ক করে বলেছেন যে, টিকার নির্ধারিত বয়সের চেয়েও কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এখন এই সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। উচ্চ জ্বর, সর্দি, কাশি এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া এই রোগের প্রধান লক্ষণ। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে এটি নিউমোনিয়া, অন্ধত্ব এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো ভয়াবহ জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে আক্রান্ত শিশুর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ইতোমধ্যে নতুন করে বিপুল পরিমাণ টিকা সংগ্রহ করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আশ্বস্ত করেছে যে, ভবিষ্যতে টিকার কোনো সংকট হবে না এবং দেশের প্রতিটি শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে টিকাদান কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে কয়েক হাজার শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে নিশ্চিত এবং সন্দেহভাজন হামে বেশ কিছু শিশুর মৃত্যু হওয়ায় জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল সরকারের প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়, বরং এই মহামারি ঠেকাতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল