প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬
হাতের মুঠোয় ভূমিসেবা: কমছে ভোগান্তি, ভেঙে পড়ছে দালাল চক্রের প্রভাব
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
একসময় জমির খতিয়ান সংগ্রহ, নামজারি কিংবা ভূমির খাজনা পরিশোধ করা ছিল সাধারণ মানুষের কাছে চরম ভোগান্তির অন্য নাম। ইউনিয়ন বা উপজেলা ভূমি অফিসের বারান্দায় দিনের পর দিন ঘুরেও সঠিক তথ্যের দেখা মিলত না। পদে পদে নথিপত্রের জটিলতা, তথ্যের অস্বচ্ছতা আর দালালদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা দিশেহারা হয়ে পড়তেন। সামান্য একটি কাগজ তুলতে গুনতে হতো বাড়তি টাকা, পোহাতে হতো সীমাহীন মানসিক যন্ত্রণা। তবে সময়ের বিবর্তনে এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন দৃশ্যপট এখন আমূল বদলে গেছে। সরকারের আধুনিকায়ন পরিকল্পনার ফলে এখন আর কাউকেই ভূমি অফিসের দ্বারে দ্বারে ধরণা দিতে হচ্ছে না; বরং হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনের মাধ্যমেই ঘরে বসে পাওয়া যাচ্ছে ভূমির যাবতীয় সেবা। এই অভাবনীয় পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনে যেমন স্বস্তি এনেছে, তেমনি নিশ্চিত করেছে সরকারি কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর পুরো ভূমি ব্যবস্থাকে একটি আধুনিক ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছে। এখন একজন নাগরিক চাইলেই অনলাইনে নামজারির আবেদন করতে পারছেন, সংগ্রহ করতে পারছেন ই-পর্চা এবং কয়েক মুহূর্তেই পরিশোধ করতে পারছেন ভূমির খাজনা। এমনকি কোনো বিষয়ে অসন্তুষ্টি থাকলে অনলাইনে অভিযোগ দাখিলের সুযোগও তৈরি হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, ভূমি ব্যবস্থাপনায় এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষকে আর সরাসরি অফিসে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে না। এতে করে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ যেমন কমেছে, তেমনি সেবার মানও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই ব্যবস্থার পূর্ণ সুফল পেতে নাগরিকদের আরও বেশি সচেতন হওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা, যাতে তারা কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর প্ররোচনায় না পড়েন।আগে এক বছর বা তারও বেশি সময়ের খাজনা দিতে লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় করতে হতো। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং এবং অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে মাত্র কয়েক মিনিটেই এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় অর্ধ কোটি মানুষ এখন অনলাইনে কর দিচ্ছেন, যার মধ্যে প্রবাসীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। তারা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসেই এখন নিজের পৈতৃক বা ক্রয়কৃত জমির কর পরিশোধ করতে পারছেন। অনেক সেবাগ্রহীতা তাদের অভিজ্ঞতায় জানিয়েছেন, আগে যেখানে খাজনা দিতে পুরো একদিন নষ্ট হতো, এখন ঘরে বসে কয়েক ক্লিকেই রসিদ হাতে পাওয়া যাচ্ছে, যা আগে ছিল অকল্পনীয়।জমি কেনাবেচার পর সবচেয়ে কঠিন ও ব্যয়বহুল ধাপ হিসেবে বিবেচিত হতো নামজারি বা মিউটেশন। দালালদের যোগসাজশে সরকারি ফির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। কিন্তু এখন অনলাইনে আবেদন করার পর থেকে প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি সরাসরি মুঠোফোনে বার্তার মাধ্যমে আবেদনকারীকে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত দেশে এক কোটিরও বেশি ই-নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে, যা ডিজিটাল ব্যবস্থার সাফল্যের বড় প্রমাণ। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও এখন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা প্রদানের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে, ফলে কাজের গতি বেড়েছে বহুগুণ।ভূমি সংক্রান্ত জালিয়াতি রোধে ডিজিটাল ম্যাপ ও খতিয়ান যাচাইয়ের সুবিধা এখন সাধারণ মানুষের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। জমি কেনার আগে ক্রেতা সহজেই অনলাইনের মাধ্যমে তথ্যের সত্যতা যাচাই করে নিতে পারছেন, ফলে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমেছে। নির্ধারিত ফি এবং সময়সীমা নির্দিষ্ট থাকায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ওপরের স্তরের কর্মকর্তারা এখন সহজেই নজরদারি করতে পারছেন যে, কোনো আবেদন অযথা আটকে রাখা হচ্ছে কি না। ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে মন্ত্রণালয়, যার মাধ্যমে জমি কেনাবেচার সাথে সাথেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিকানা হালনাগাদ হয়ে যাবে। এর ফলে জমির সীমানা বিরোধ এবং মামলা-মোকাদ্দমা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল