প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
মাসে ১০০ টাকায় ফুটপাতের বৈধ ব্যবসা, রাজধানীতে হকারদের জন্য আসছে স্মার্টকার্ড ব্যবস্থা
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
রাজধানীর ফুটপাতকেন্দ্রিক হকার বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অব্যবস্থাপনা, দখল ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। এখন থেকে প্রতিদিন চাঁদা দিয়ে নয়, বরং মাসিক বা বার্ষিক নির্ধারিত ফি পরিশোধের মাধ্যমে বৈধভাবে ফুটপাতে ব্যবসা করতে পারবেন নিবন্ধিত হকাররা। মাসে ১০০ টাকা কিংবা বছরে এক হাজার টাকা ফি দিয়ে রাজধানীর নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় হকারদের দেওয়া হবে বিশেষ স্মার্টকার্ড, যেখানে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য থেকে শুরু করে ব্যবসার স্থান, সময় ও ধরন পর্যন্ত সবকিছু সংরক্ষিত থাকবে।স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদিত নতুন হকার নীতিমালার ভিত্তিতে রাজধানীতে এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকশ হকারকে নিবন্ধনের আওতায় এনে স্মার্টকার্ড দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ফুটপাতকে সাধারণ মানুষের চলাচলের উপযোগী রাখা, একই সঙ্গে হকারদেরও একটি বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনা।বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংশ্লিষ্ট থানা, ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে হকারদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। গুলিস্তান, নিউমার্কেট ও মিরপুর ১০ নম্বরসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কোথায় কোথায় হকার বসতে পারবেন, সেই স্থান নির্ধারণের কাজও শেষ হয়েছে। নির্ধারিত স্থানে ব্যবসা করার জন্য হকারদের সিটি করপোরেশনের নিবন্ধন ফরম পূরণ করতে হচ্ছে। সেখানে স্থায়ী ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য তথ্য জমা দিতে হচ্ছে। পরে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, হকারদের এমন জায়গায় বসানো হবে যেখানে পথচারীদের চলাচলের জন্য অন্তত পাঁচ ফুট খালি জায়গা থাকবে। যানজট এড়াতে মেট্রোস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের কাছাকাছি এলাকায় নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এছাড়া সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে কিছু এলাকায় বিশেষ বাজার বসানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। জনবহুল ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে অফিস শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত ব্যবসা করতে পারবেন নিবন্ধিত হকাররা।তবে কিছু স্থানে হকার বসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। খেলার মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ, ধর্মীয় উপাসনালয়, গণপরিসর কিংবা কবরস্থানের আশপাশে কোনো ধরনের হকার বসতে পারবেন না। নির্ধারিত স্থানে স্থায়ী কোনো স্থাপনা নির্মাণও নিষিদ্ধ থাকবে। কেবল অস্থায়ী ছাউনি বা ছাতা ব্যবহার করা যাবে। নিয়ম ভঙ্গ করলে নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতা থাকবে কর্তৃপক্ষের হাতে।নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, হকার হতে হলে ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর হতে হবে। প্রত্যেক নিবন্ধিত হকারের স্মার্টকার্ডে কিউআর কোড থাকবে, যার মাধ্যমে তার সব তথ্য যাচাই করা যাবে। একটি পরিবারের একজনের বেশি সদস্য হকার হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারবেন না। ব্যবসা পরিচালনার সময় পরিচয়পত্র বা স্মার্টকার্ড সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। পাশাপাশি নারী, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য বিশেষ কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।হকার ব্যবস্থাপনা তদারকিতে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক কমিটি গঠন করা হবে। এসব কমিটিতে সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ, রাজউক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধিরা থাকবেন। তাদের দায়িত্ব হবে কোথায় হকার বসানো যাবে, কীভাবে শৃঙ্খলা বজায় রাখা হবে এবং ফুটপাত ব্যবহারে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানো যায়, তা নিশ্চিত করা।এদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজধানীর প্রায় পাঁচ লাখ হকারের কাছ থেকে বছরে হাজার কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করা হয়। প্রতিদিন গড়ে প্রতিটি হকারকে প্রায় দুইশ টাকার কাছাকাছি চাঁদা দিতে হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অর্থের ভাগ বিভিন্ন মহলে পৌঁছায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই অনিয়ন্ত্রিত চাঁদাবাজি কমে আসবে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।তবে হকার নেতাদের একাংশ এই উদ্যোগ নিয়ে শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, সীমিত সংখ্যক হকারকে বৈধতার আওতায় আনা হলেও বিপুলসংখ্যক মানুষ তালিকার বাইরে থেকে যাবেন। এতে উচ্ছেদ আতঙ্ক আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তাদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও একটি পূর্ণাঙ্গ হকার আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি এলাকায় কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। পরে ধাপে ধাপে রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও এই ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে। তারা আশা করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরবে এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল