প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
গোপনে ইরানে হামলা চালাচ্ছে আরব আমিরাত, দাবি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা বর্তমানে এক নতুন এবং জটিল মোড় নিয়েছে। দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক অস্থিরতার মাঝে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চললেও পর্দার আড়ালে সংঘাত থামেনি। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতি চলাকালেই ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত সামরিক অবস্থানে হামলা চালিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আরব আমিরাত প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি এমন পাল্টা সামরিক অভিযানে লিপ্ত হলো, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আরব আমিরাত তাদের পশ্চিমা প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইরানের অভ্যন্তরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। যদিও আমিরাত সরকার এসব হামলার বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে পারস্য উপসাগরের লাভান দ্বীপে অবস্থিত ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার এই হামলার শিকার হয়েছে। গত এপ্রিলের শুরুতে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাঁচ সপ্তাহব্যাপী সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে এই হামলাটি চালানো হয়। এর ফলে শোধনাগারটিতে বিশাল অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয় এবং এর উৎপাদন ক্ষমতা আগামী কয়েক মাসের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে। ইরান এই ঘটনার পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আমিরাত ও কুয়েতের ওপর আক্রমণ চালায়, যা পরিস্থিতিকে আরও অগ্নিগর্ভ করে তোলে।এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে ইসরায়েলের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতকে রক্ষায় তেল আবিব সরাসরি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন যে, যুদ্ধের সময় আমিরাতকে রক্ষা করার জন্য ইসরায়েল তাদের বিখ্যাত আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী সরবরাহ করেছে। এই সামরিক জোটবদ্ধতা প্রমাণ করে যে, ইরানকে মোকাবিলায় আরব দেশগুলো এবং ইসরায়েল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ।এদিকে এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর ক্ষত তৈরি করছে। বিবিসি এবং মার্কিন ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্যমতে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ১০৭ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কমার্জব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরামকোর প্রধান সতর্ক করেছেন যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহনে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজার স্থিতিশীল হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই আগ্রাসী সামরিক অবস্থান মূলত মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব রক্ষার একটি বহিঃপ্রকাশ। দেশটি এখন কেবল আলোচনার টেবিলে নয়, বরং রণক্ষেত্রেও নিজের শক্তি প্রদর্শনে দ্বিধাবোধ করছে না। তবে এই শক্তির লড়াই শেষ পর্যন্ত অঞ্চলটিকে শান্তি নাকি ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।তথ্যের মূল উৎস: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল