প্রিন্ট এর তারিখ : ১৪ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬
ফিচের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে নতুন শঙ্কা
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থা ফিচ রেটিংস বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এক উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আগের তুলনায় সংকুচিত হয়ে আসতে পারে। এর ফলে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুআর ডিফল্ট রেটিং বা ঋণমানের পূর্বাভাসকে ‘স্থিতিশীল’ পর্যায় থেকে নামিয়ে ‘ঋণাত্মক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও ফিচ এখনই বাংলাদেশের বর্তমান ঋণমান বা রেটিং কমায়নি, বর্তমানে এটি ‘বি প্লাস’ পর্যায়েই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এই মানদণ্ডের অর্থ হলো, বাংলাদেশ এখনও সময়মতো ঋণ পরিশোধে সক্ষম হলেও দেশটির অর্থনীতি এখন নানাবিধ বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্রমহ্রাসমান অবস্থা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে সংস্থাটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।ফিচ তাদের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় একটি অংশও মেটানো হয় ওই অঞ্চল থেকে আমদানি করা তেলের মাধ্যমে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি আমদানির খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি প্রবাসী আয়েও টান পড়তে পারে। সংস্থাটি মনে করছে, বর্তমান প্রশাসনের সংস্কার কার্যক্রমের ধীরগতি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তাও বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতাকে তিলে তিলে দুর্বল করে দিচ্ছে। কোনো দেশের রেটিং যখন ‘ঋণাত্মক’ পূর্বাভাসে থাকে, তখন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা ভবিষ্যতে বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়েও প্রতিবেদনে বিশদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রিজার্ভ এখন ২৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে প্রায় চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। এই পরিমাণটি একই শ্রেণির অন্যান্য দেশের গড় রিজার্ভের তুলনায় কম। যদিও সরকার বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে নতুন পদ্ধতি চালু করেছে এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থায়ন আসছে, তবুও মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি। ফিচ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, যদি চলতি হিসাবের ঘাটতি আরও বাড়ে কিংবা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে কোনো ধরনের বাধার সৃষ্টি হয়, তবে মুদ্রা ও রিজার্ভের ওপর চাপ আরও অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে।বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের চিত্রটিও বেশ হতাশাজনক বলে ফিচের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরেই রাজস্ব ও জিডিপির অনুপাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশাল অংকের কর ছাড়, কর প্রশাসনের অদক্ষতা এবং কর পরিশোধে সাধারণ মানুষের অনীহার কারণে এই অনুপাত গত অর্থবছরের তুলনায় আরও কমে ৭ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। রাজস্বের এই ঘাটতি সরাসরি সরকারের বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। একইসঙ্গে দেশে জ্বালানি তেলের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ আরও প্রকট হচ্ছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ অর্থবছর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশেপাশে অবস্থান করতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি উভয়কেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে।মূল তথ্যসূত্র: ফিচ রেটিংস।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল