প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী উদ্যোগ, উৎপাদিত হবে সার
তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক ||
শহরের নোংরা ড্রেন এবং কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য মিশ্রিত দূষিত পানি বর্তমান বিশ্বের পরিবেশের জন্য এক বড় অভিশাপ ও মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে আধুনিক বিজ্ঞানের আশাতীত উন্নতির ফলে এই বর্জ্য পানিই এখন মানবজাতির উপকারে আসতে চলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সেই বিষাক্ত ও দূষিত পানিকে অত্যন্ত মূল্যবান রাসায়নিক সারে রূপান্তরের এক বৈপ্লবিক এবং যুগান্তকারী পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন চীনের একদল গবেষক ও বিজ্ঞানী। নতুন এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সাহায্যে বর্জ্য পানির ক্ষতিকর নাইট্রেট দূষণ সম্পূর্ণ দূর করার পাশাপাশি তা থেকে অতি প্রয়োজনীয় কৃষিকাজে ব্যবহারযোগ্য উচ্চমানের অ্যামোনিয়া সার তৈরি করা সম্ভব বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন। এই অনন্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে বর্তমান বিশ্বের সম্পদের চক্রাকার পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থার একটি শ্রেষ্ঠ এবং উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে গণ্য করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি আমেরিকার বিখ্যাত ও আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত বিজ্ঞান সাময়িকী 'জার্নাল অব দ্য আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি'-তে এই অসাধারণ গবেষণার বিস্তারিত প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে।প্রকাশিত সেই গবেষণাপত্রের তথ্যানুযায়ী, বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিখুঁত হিসাব-নিকাশ ব্যবহার করে নাইট্রেট থেকে অ্যামোনিয়া তৈরি করার জন্য সবচেয়ে বেশি কার্যকর একটি দ্বিপরমাণু অনুঘটক খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছেন। অত্যন্ত শক্তিশালী এই অনুঘটকটি বর্জ্য পানিতে থাকা নাইট্রেট অণুর ভেতরের নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনের মধ্যকার কঠিন রাসায়নিক বন্ধনীকে খুব সহজেই ভেঙে ফেলতে পারে এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সেটিকে ব্যবহার উপযোগী অ্যামোনিয়ায় রূপান্তর করে। দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতে ব্যবহৃত যেকোনো সনাতন প্রযুক্তির তুলনায় নতুন এই আধুনিক পদ্ধতিতে রূপান্তরের গতি ও হার প্রায় তিন গুণ বেশি। সাধারণত কৃষিজমি এবং শিল্প কলকারখানার ফেলে দেওয়া বর্জ্য পানিতে নাইট্রেটের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি থাকে, যা এই নতুন বিদ্যুৎ-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরাসরি মাঠের সারে পরিণত করা সম্ভব হবে।বর্তমান পৃথিবীতে অ্যামোনিয়া সার উৎপাদনের জন্য মূলত প্রায় শত বছরের পুরোনো একটি প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সেই সনাতন পদ্ধতিতে নাইট্রোজেন থেকে সার তৈরি করতে বিপুল পরিমাণ তাপ এবং অতিরিক্ত উচ্চ চাপের প্রয়োজন হয়, যা একদিকে যেমন প্রচুর পরিমাণে শক্তির অপচয় করে, অন্যদিকে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। কিন্তু চীনা বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত এই নতুন বিদ্যুৎ-রাসায়নিক পদ্ধতিটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি সাধারণ ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেই অত্যন্ত চমৎকারভাবে কাজ করতে পারে। যার ফলে প্রচলিত পুরোনো পদ্ধতির তুলনায় এই নতুন প্রযুক্তিতে শক্তির অপচয় ও খরচ একেবারেই কম হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ সম্পূর্ণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা অর্জনে অ্যামোনিয়া উৎপাদনের এই নতুন পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিটি এক অভাবনীয় ভূমিকা পালন করবে।বর্জ্য পানির এই ক্ষতিকর নাইট্রেট দূষণ মূলত নদী, নালা ও সমুদ্রের মতো প্রাকৃতিক জলাশয়ের জন্য এক মহা আতঙ্ক। যখন কৃষিজমি বা কারখানার অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান ধুয়ে সরাসরি নদ-নদী বা সাগরে গিয়ে মেশে, তখন সেখানে জলজ উদ্ভিদের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে পানিতে অক্সিজেনের তীব্র অভাব দেখা দেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় এই ক্ষতিকর অবস্থাকে বলা হয় জলাশয়ের প্রাণহীন মৃত অঞ্চল, যেখানে অক্সিজেনের অভাবে মাছ কিংবা অন্য কোনো জলজ প্রাণী কোনোভাবেই বেঁচে থাকতে পারে না। আমেরিকার পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থাও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, নাইট্রোজেন এবং ফসফরাসের সঠিক ব্যবস্থাপনা করা বর্তমান বিশ্বের জলজ পরিবেশের জন্য অন্যতম বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে চীনা বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত এই নতুন পদ্ধতিটি বর্জ্য পানি থেকে অতিরিক্ত নাইট্রোজেনকে সফলভাবে ছেঁকে তুলে সরাসরি স্থানীয় খামারগুলোর ফসল উৎপাদনে সরবরাহ করতে পারবে, যা প্রকৃতির সামগ্রিক ভারসাম্য রক্ষায় বড় অবদান রাখবে।পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রচলিত পদ্ধতিতে যে পরিমাণ অ্যামোনিয়া সার উৎপাদিত হয়, তা থেকে নির্গত ধোঁয়া বিশ্বের মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের প্রায় এক দশমিক চার শতাংশের জন্য দায়ী। কিন্তু চীনের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত এই অভিনব পদ্ধতিতে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহার করে সরাসরি দূষিত পানি থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করা হবে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও ফসল উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে এবং পৃথিবী এক সবুজ ও নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।মূল উৎস: 'টাইমস অব ইন্ডিয়া'
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল