প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
মাতৃগর্ভ থেকে বার্ধক্য—নতুন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
বাংলাদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ কল্যাণকর রাষ্ট্রে রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা নিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে এই নতুন বাজেট উপস্থাপন করা হবে, যা বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট হতে যাচ্ছে। নতুন এই বাজেটে দেশের প্রচলিত ও খণ্ডিত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী থেকে সরে এসে সব নাগরিকের জন্য একটি সমন্বিত এবং সর্বজনীন কাঠামো গড়ার ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। মূলত মানুষের গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বেকারত্ব এবং বার্ধক্যের শেষ দিন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার আওতায় নিয়ে আসতেই এই যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা দারিদ্র্যের অবসান ঘটানোই এই নতুন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি নাগরিককে তাদের জীবনচক্রের প্রতিটি ধাপে রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নিয়ে আসা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আগামী অর্থবছর থেকেই একটি আধুনিক ও গতিশীল সামাজিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা হবে। এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হবে এক ব্যক্তি, একটি অ্যাকাউন্ট নীতি, যার মাধ্যমে প্রকৃত অভাবী মানুষ সরাসরি রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাবেন। উন্নয়ন সহযোগী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইতিপূর্বে এই ধরনের জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রাথমিক কিছু কাজ শুরু হলেও পরে তা স্থিমিত হয়ে পড়েছিল। এখন সরকারকে এই ব্যবস্থা সফল করতে হলে সুনির্দিষ্ট কৌশল, সম্ভাব্য খরচের নিখুঁত হিসাব এবং আগামী দেড় থেকে দুই দশকের জনসংখ্যাভিত্তিক প্রাক্কলন তৈরি করতে হবে। বর্তমানে দেশে চলমান কর্মসূচিগুলো একেকটি বিচ্ছিন্নভাবে চলছে এবং তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। অনেকেই পড়াশোনা শেষ করে দীর্ঘদিন বেকার থাকছেন, আবার কর্মজীবন থেকে অবসরে যাওয়ার পর কোনো ধরনের পেনশন পাচ্ছেন না। সরকার যদি একটি সামগ্রিক ও টেকসই রূপরেখা তৈরি করতে পারে, তবেই এর বাস্তব রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।বিশ্বের বহু উন্নত রাষ্ট্র, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, সুইডেন, ডেনমার্ক ও কানাডার মতো দেশগুলো বহু বছর ধরে এই ধরনের জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা মডেল সফলভাবে পরিচালনা করে আসছে। বাংলাদেশও অতীতে এই ধরনের কৌশল প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও তা মাঝপথে থেমে যায়। যদিও বর্তমানে দেশে গর্ভকালীন ভাতা, মায়েদের সহায়তা, উপবৃত্তি এবং বয়স্ক ভাতাসহ বেশ কিছু কর্মসূচি চালু রয়েছে, কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট ও একক নিয়মের অধীনে না থাকায় এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমান সুবিধাভোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসলে এই সহায়তার যোগ্য নন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের এই নতুন উদ্যোগ ধীরে ধীরে সারা দেশের মানুষকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসবে। তবে তার আগে সুবিধাভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ার ত্রুটিগুলো দূর করতে হবে, কারণ অতীতে বিভিন্ন কার্ড বিতরণে বড় ধরনের অনিয়ম ও অযোগ্যদের অন্তর্ভুক্তির প্রমাণ মিলেছে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই বিশাল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বা কর আদায় করা।সরকারের প্রাথমিক খসড়া অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটে অবকাঠামোগত বড় বড় প্রকল্পের চেয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ চলতি অর্থবছরের ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে আগামী বাজেটে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকারও ওপরে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০৩২ সালের মধ্যে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে এই সর্বজনীন কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক সম্মেলনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ফোরামে প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বেষ্টনীতে নিয়ে আসার এই প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সরকারের এই বিশেষ প্রকল্পের আওতায় আগামী অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে বিশেষ পারিবারিক সুবিধা এবং ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে কৃষিভিত্তিক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে আরও ৩৪ লাখ মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। সব মিলিয়ে ১ কোটি ২১ লাখের বেশি মানুষকে নতুন করে এই সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে, যার ফলে দেশের সাড়ে তিন কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় নগদ অর্থ ও খাদ্য সহায়তার সুবিধা পাবেন।সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য একটি নতুন এবং সংশোধিত বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে এবারের বাজেটে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনা করে এই বাড়তি মূল বেতনের অর্ধেক আগামী অর্থবছরে এবং বাকি অর্ধেক তার পরের অর্থবছরে দেওয়া হতে পারে। এরপরের বছর থেকে নতুন কাঠামো অনুযায়ী সব ধরনের ভাতা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এদিকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে দেশের প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয় বাড়ানোর তীব্র চাপ রয়েছে সরকারের ওপর। বিশেষ করে দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কেনাসহ সামরিক আধুনিকায়নের জন্য আগামী বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতেও অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল