প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ফি বৃদ্ধিতে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে আসা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি কয়েক গুণ বৃদ্ধি করার সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এই নীতিমালায় কিছুটা ছাড় দেওয়ার ঘোষণা এলেও তা শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাকে শান্ত করতে পারেনি। আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট বক্তব্য, এই পদক্ষেপটি সম্পূর্ণ বৈষম্যমূলক এবং এটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ফরাসি মাটিতে পড়াশোনার পথকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সংকুচিত করে তুলবে। সম্প্রতি রাজধানী প্যারিসসহ ফ্রান্সের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও এই মিছিলে সংহতি জানিয়ে যোগ দেন। প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী লাতিন কোয়ার্টারে আয়োজিত কেন্দ্রীয় সমাবেশে কয়েক শ বিক্ষোভকারী ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে সরকারের এই কঠোর সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানান এবং তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি করেন।এই আন্দোলনের সম্মুখভাগে রয়েছে ফ্রান্সের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ছাত্র ও শিক্ষক সংগঠন। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের প্ল্যাকার্ডে সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান আইনি ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানানো হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতির মুখে ফ্রান্সের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী ফিলিপ বাতিস্ত একটি বিবৃতিতে জানান যে, নতুন ফি কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কিছুটা স্বায়ত্তশাসন ও নমনীয়তা দেখানো হবে। সংশোধিত নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে আসা মোট শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ ২০ শতাংশকে এই অতিরিক্ত টিউশন ফি প্রদান থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ পাবে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ পরিকল্পনার আওতায় জানানো হয়েছিল যে, বিগত ২০১৯ সালে গৃহীত বিদেশি শিক্ষার্থীদের পৃথক ফি কাঠামোটি এবার দেশজুড়ে কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে। যদিও ফরাসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে এই নীতিটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছিল।ফরাসি সরকারের দাবি, এই নতুন অর্থনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক ভিত্তি যেমন মজবুত হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফরাসি শিক্ষাব্যবস্থা ও ডিগ্রির মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজার থেকে আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করাও এই পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তবে সরকারের এই যুক্তির সঙ্গে বিন্দুমাত্র একমত নন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, শিক্ষার মতো একটি মৌলিক জায়গায় এমন বিশাল অঙ্কের ফি আরোপ করার ফলে এশিয়া ও আফ্রিকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন চিরতরে ভেঙে যাবে। প্যারিসে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত আলজেরীয় ও মালির কয়েকজন শিক্ষার্থী গণমাধ্যমের কাছে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ফ্রান্স আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে তার দীর্ঘদিনের আকর্ষণ ও গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। অনেক শিক্ষার্থীকে এখন পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের টিকে থাকার জন্য অতিরিক্ত খণ্ডকালীন কাজ করতে হচ্ছে, যা তাদের শিক্ষার মানকে ব্যাহত করছে।নতুন প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতক পর্যায়ে বার্ষিক টিউশন ফি বর্তমানের ১৭৮ ইউরো থেকে এক লাফে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে ২ হাজার ৮৯৫ ইউরো। একইভাবে স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স পর্যায়ে বর্তমানের ২৫৪ ইউরোর স্থলে একজন শিক্ষার্থীকে গুনতে হবে ৩ হাজার ৯৪১ ইউরো। ফরাসি পার্লামেন্টে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্ধিত এই ফি নির্ধারণের পরও একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার পেছনে প্রকৃত ব্যয়ের সিংহভাগ রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকেই বহন করা হচ্ছে। এর আগে প্রথম খসড়ায় মাত্র ১০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে ফি মওকুফের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হলেও তীব্র প্রতিবাদের মুখে সরকার তা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করতে বাধ্য হয়। এছাড়াও প্রথম বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বিশেষ ছাড় দিতে পারবে, যা পরবর্তী বছরগুলোতে ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা হবে। তবে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলো এই আংশিক বা সাময়িক ছাড়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা বাতিলের দাবিতে তারা আগামী ২৬ মে আবারও দেশজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দিয়েছে, যা ফ্রান্সের শিক্ষাঙ্গনে চলমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল