প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে ২৭ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনা
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির জটিল সমীকরণকে মাথায় রেখে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়ানোর মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে যুগোপযোগী ও আধুনিক যুদ্ধশক্তিরূপে গড়ে তুলতে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার আওতায় আকাশসীমা নিশ্ছিদ্র রাখতে বিমানবাহিনীর জন্য বহুমাত্রিক যুদ্ধবিমান, লক্ষ্যভেদী আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার, চালকবিহীন অত্যাধুনিক ড্রোন ব্যবস্থা ও নিখুঁত রাডারসহ উন্নত যুদ্ধ সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের স্থলভাগে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন মোকাবিলায় সেনাবাহিনীকে একটি অপরাজেয় ও শক্তিশালী প্রতিরোধ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, ভারী গোলাবারুদ ও বিশ্বমানের রসদ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখতে নৌবাহিনীর রণক্ষমতা বৃদ্ধি ও কৌশলগত আধুনিকায়নের জন্যও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা গেছে, এই বিশাল আধুনিকায়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিশেষ সামরিক সরঞ্জাম কেনার উদ্দেশ্যে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের একটি লিখিত সুপারিশ সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এই বিশেষ প্রস্তাবটি বর্তমান শাসকদলের নির্বাচনী ইশতেহার ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় করে সাজানো হয়েছে। তবে এটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামগ্রিক পরিচালনার বাজেট নয়, বরং সম্পূর্ণ নতুন ও উন্নত সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য একটি স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক রূপরেখা, যা বর্তমানে সরকারের অর্থ বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে। বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতের জন্য মোট ৪০ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এর আগের অর্থবছরগুলোতেও এই ব্যয়ের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের সামরিক খাতের ধারাবাহিক অগ্রগতির প্রমাণ দেয়। সমসাময়িক এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে দেশের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বও স্পষ্ট করে বলেছেন যে, একটি দেশের শক্তিশালী সামরিক প্রস্তুতি যুদ্ধের জন্য নয়, বরং সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়াতে এবং কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি সমুদ্রপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় নৌ ও বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।এই বিশাল বাজেটের একটি বড় অংশ অর্থাৎ প্রায় ১২ হাজার ২৩২ কোটি ১৮ লাখ টাকা বরাদ্দ করার প্রস্তাব করা হয়েছে কেবল বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন পরিকল্পনার জন্য। এই অর্থ দিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হবে। যার মধ্যে রয়েছে রাডার সংযোজিত অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং অতি সংবেদনশীল দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যা দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে দক্ষ সামরিক বৈমানিক, প্রকৌশলী ও কারিগরি টেকনিশিয়ান তৈরির মাধ্যমে বিমানবাহিনীকে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, সেনাবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে প্রায় ৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দিয়ে পদাতিক ও সাঁজোয়া বাহিনীর জন্য আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র কেনা হবে। দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে স্বাবলম্বী করতে এবং সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে আরও এক হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা এবং অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণার্থে বিশেষ পেনশন ব্যবস্থার জন্য এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে এবং দেশীয় জাহাজ নির্মাণশিল্পকে উৎসাহিত করতে দেশের অভ্যন্তরেই চারটি বড় আকৃতির টহল জাহাজ নির্মাণের জন্য প্রায় ৭৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি কক্সবাজারের পেকুয়ায় অবস্থিত বিশেষ সাবমেরিন ঘাঁটির জন্য আধুনিক ড্রেজার ও প্রশিক্ষণ সিমুলেটরসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কেনাকাটার জন্য আরও ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু সামরিক সরঞ্জামই নয়, সশস্ত্র বাহিনীর তিন শাখার অবকাঠামোগত মানোন্নয়নের জন্যও প্রায় ৫৮১ কোটি টাকার একটি বড় তহবিল প্রস্তাব করা হয়েছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হবে একটি বিশেষ আকাশযান শনাক্তকরণ ব্যবস্থা স্থাপনে এবং বাকি অর্থ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ দেশের প্রধান প্রধান নৌঘাঁটিগুলোতে প্রশাসনিক ভবন, বহুতল আবাসিক কোয়ার্টার, হাসপাতাল ও আধুনিক বহুমুখী কমপ্লেক্স নির্মাণে ব্যবহার করা হবে। এই সামগ্রিক উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশা করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল