প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
ইউরেনিয়াম ইস্যুতে অচল শান্তি আলোচনা, ২০ বছর বিরতি চান ট্রাম্প
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
পারমাণবিক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান উপাদান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র মতবিরোধের জেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা গভীর অচলাবস্থায় পতিত হয়েছে। মূলত এই একটি জটিল বিষয়কে কেন্দ্র করেই দুই দেশের শীর্ষ কূটনীতিকরা কোনো সর্বসম্মত সমাধানে পৌঁছাতে পারছেন না। এই স্পর্শকাতর পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্প্রতি মুখ খুলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ভারতের নতুন দিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি স্পষ্ট জানান যে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ ও এর পরিচালন পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনা বর্তমানে এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে। তবে এই আলোচনার পথকে আরও জটিল ও কুয়াশাচ্ছন্ন করে তোলার জন্য তিনি মার্কিন প্রশাসনের পাঠানো তথাকথিত পরস্পরবিরোধী ও অস্পষ্ট বার্তাকেই সম্পূর্ণ দায়ী করেছেন। অবশ্য ইউরেনিয়ামের মতো জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে কোনো ধরনের গোপন দরকষাকষি হচ্ছে— এমন দাবি তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নিয়ে তেহরানের গভীর সন্দেহ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান যে, ইরান ইতিমধ্যে তাদের উৎপাদিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের একটি বিশেষ প্রস্তাব নিয়ে রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে।ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই চাঞ্চল্যকর বক্তব্য এমন একটি সময়ে সামনে এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সাম্প্রতিক চীন সফর শেষ করেছেন। এই সফরে চীন উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন যে, বেইজিং মনে করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির চলমান সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমেই সম্ভব। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই বিষয়ে জোর দিয়েছেন যে, কোনো ধরনের সামরিক বল প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্ব সংকটের সমাধান হয় না এবং পারস্পরিক সংলাপই শান্তির একমাত্র সঠিক পথ। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও মনে করেন যে, এই ধরনের জটিল রাজনৈতিক আলোচনা রাতারাতি সফল হবে না, তবে একবার যদি আলোচনার দুয়ার খুলে যায়, তবে কোনো পক্ষেরই তা আর বন্ধ করা উচিত হবে না।অন্য দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পারমাণবিক অচলাবস্থা নিরসনে একটি নতুন শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। চীন সফর শেষে তাঁর বিশেষ বিমানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, ইরান যদি আগামী ২০ বছরের জন্য তাদের সমস্ত পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ স্থগিত রাখতে সম্মত হয়, তবেই তিনি তাদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় আসতে রাজি আছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন কঠোর অবস্থানের বিপরীতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি নিজ দেশের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। জাতীয় ফারসি ভাষা সংরক্ষণ দিবস ও মহাকবি ফেরদৌসির স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইরানের সাহসী ও বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ দেশকে যেকোনো মার্কিন আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য আরও শক্তিশালী ও প্রস্তুত করে তুলেছে। তাঁর মতে, চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরানিরা প্রমাণ করেছে যে, ফেরদৌসির মহাকাব্যের কিংবদন্তিতুল্য বীরত্বের কাহিনিগুলো আসলে কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং তা ইরানি জাতির বাস্তব জীবন ও চরিত্রের প্রতিফলন।ইউরোপীয় অঞ্চলের অন্যতম পরাশক্তি জার্মানিও এই বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুরেই কথা বলেছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস চীন থেকে ফেরার পথে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক জরুরি ফোনালাপে অংশ নেন। ফোনালাপ শেষে জার্মান চ্যান্সেলর জানান, তারা দুজনেই এই বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত হয়েছেন যে, ইরানকে অবিলম্বে কোনো শর্ত ছাড়াই আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই দেশটির হাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরীর প্রযুক্তি রাখতে দেওয়া যাবে না। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে ইরানকে অবশ্যই হরমুজ প্রণালির নৌপথ উন্মুক্ত করে দিতে হবে। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর এমন চাপের মুখেও নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে তেহরান। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বার্তায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরান ঐতিহাসিক কাল থেকেই হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার প্রধান রক্ষক ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তিনি বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, ইরানের সমস্ত বন্ধু ও মিত্র রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তার জন্য তেহরানের ওপর পূর্ণ ভরসা রাখতে পারে।এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর দেশে কর্মরত এক সংবাদকর্মীর ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। চীন সফর শেষে ফেরার পথে বিমানের অভ্যন্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে ওই সাংবাদিক মার্কিন প্রশাসনকে একটি অত্যন্ত জটিল ও সমালোচনামূলক প্রশ্ন করেছিলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প ওই সাংবাদিককে মিথ্যাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং তাঁর লেখা প্রতিবেদনকে রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল বলে মন্তব্য করেন। ট্রাম্প দাবি করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক বিজয় অর্জন করেছে যা বিশ্বজুড়ে সবাই একবাক্যে স্বীকার করে, কেবল কিছু পক্ষপাতদুষ্ট গণমাধ্যম ছাড়া। এই রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার মাঝেই মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতি নিয়ে এক নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। তিনি আন্তর্জাতিক এক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য বন্ধু দেশগুলোর অভ্যন্তরে বিকল্প পাইপলাইন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে। এই নতুন অবকাঠামো তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির ওপর ভূ-রাজনৈতিক নির্ভরতা ও গুরুত্ব অনেকটাই হ্রাস পাবে। তিনি মনে করেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি নিরাপদে বের করার জন্য বিকল্প পথ তৈরি হলে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলেও বৈশ্বিক বাজারে তার প্রভাব পড়বে না এবং মার্কিন মিত্ররা বিশ্বের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখে অঞ্চলে শান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে পারবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল