প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পর তিনবিঘায় বিএসএফের নজরদারি জোরদার, দহগ্রামে বাড়ছে উদ্বেগ
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
লালমনিরহাট জেলা শহর থেকে প্রায় একশত কিলোমিটার দূরের এক প্রান্তিক জনপদ পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ইউনিয়ন। চারদিকে ভারতের ভূখণ্ড দ্বারা বেষ্টিত এই অবরুদ্ধ ভূখণ্ডে বর্তমানে প্রায় বাইশ হাজার মানুষের বসবাস। ভৌগোলিক কারণে চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন এই ইউনিয়নে যাতায়াতের একমাত্র পথ হলো বহুল আলোচিত তিনবিঘা করিডর। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সম্প্রতি এই একমাত্র পারাপারের পথে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা এলাকার সাধারণ বাসিন্দাদের যাতায়াতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হয়রানি, কড়াকড়ি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত মানসিক চাপ আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।বিগত ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের বাসিন্দাদের যাতায়াতের চিরন্তন কষ্ট লাঘব করতে এই করিডরটি দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় ভারত। বর্তমানে এই অত্যন্ত সংকীর্ণ ও সরু রাস্তাটি দিয়ে দুই দেশের নাগরিকেরা যাতায়াত করে থাকেন এবং রাস্তার ঠিক মাঝখানে আইনশৃঙ্খলা ও সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদস্যরা। অথচ ঐতিহাসিক ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরযোগ্য এই তিনবিঘা করিডরের প্রকৃত আয়তন হওয়ার কথা ছিল দৈর্ঘ্যে ১৭৮ মিটার এবং প্রস্থে ৮৫ মিটার। কিন্তু নির্মম বাস্তবতার কারণে সাবেক এই ছিটমহলের বাসিন্দারা আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী তাদের ন্যায্য ভূমির অধিকার পাচ্ছে না, বরং তারা ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে মাত্র নয় ফুট চওড়া একটি অত্যন্ত সরু পাকা রাস্তা। এই সংকীর্ণ পথের কারণে দৈনন্দিন পারাপারে সীমাহীন দুর্ভোগ ও নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে এই অঞ্চলের প্রায় বাইশ হাজার অবরুদ্ধ মানুষকে।তার ওপর এই সামান্য নয় ফুটের রাস্তার মধ্যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চেকপোস্ট, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা, ট্রাফিক পোস্ট এবং সুউচ্চ অবজারভেশন টাওয়ারের সমন্বয়ে এমন এক নিশ্ছিদ্র ও কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে, যার ভেতর দিয়ে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার বাসিন্দাদের চরম অস্বস্তির মধ্যে যাতায়াত করতে হয়। বর্তমানের এই সরু রাস্তায় কোনো চার চাকা বা ছয় চাকার পণ্যবাহী গাড়ি প্রবেশ করলে দুই পাশের সব ধরনের সাধারণ যানবাহনকে দীর্ঘক্ষণ পানবাড়ী বা দহগ্রাম পোস্টে অবরুদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করতে হয়। একটি গাড়ি সম্পূর্ণ পার হওয়ার পর কেবল অপেক্ষমাণ অন্যান্য যানবাহনগুলো যাতায়াতের সুযোগ পায়। এর ওপর করিডরের দুই ধারে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে লাইটপোস্ট ও ফুলের টব লাগানোর ফলে মূল চলাচলের পথটি সংকুচিত হয়ে মাত্র নয় থেকে দশ ফুটে এসে ঠেকেছে। এর ফলে অনেক সময় অসাবধানতাবশত কোনো বাংলাদেশি গাড়ির বাম্পার কিংবা মালামালের ধাক্কায় ভারতীয় কোনো স্থাপনার সামান্য ক্ষতি হলে স্থানীয় বাংলাদেশিদের নানা রকম মানসিক হয়রানির শিকার হতে হয় এবং চড়া অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে স্থানীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকে তিনবিঘা করিডর এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের নজরদারি ও তল্লাশি অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে, যার বিপরীতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও সীমান্তে এক ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের সেই ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির স্পষ্ট শর্তগুলোকে এক প্রকার বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ভারত এখনো তিনবিঘা করিডরের মূল নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলেই রেখে দিয়েছে। যদিও সেই চুক্তি অনুসারে উভয় দেশেরই তাদের নিজস্ব ছিটমহল যথাক্রমে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা এবং দক্ষিণ বেরুবাড়ীতে যাতায়াত সুবিধা সুনিশ্চিত করার কথা ছিল। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের জাতীয় সংসদে বিল পাস করার মাধ্যমে দুই বর্গমাইল আয়তনের দক্ষিণ বেরুবাড়ী অঞ্চলটি ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছিল। তবে ভারতের পক্ষ থেকে তিনবিঘা করিডরটি বাংলাদেশের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের দেশের সংবিধান সংশোধনের একটি আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল, যা নানামুখী রাজনৈতিক জটিলতা ও অনীহার কারণে আজও আলোর মুখ দেখেনি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের দীর্ঘদিনের তীব্র আপত্তি ও কূটনৈতিক বিরোধিতার পর ২০১১ সালে ভারত সরকার এটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করার বদলে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ইজারা হিসেবে দিতে সম্মত হয়। তবে সেখানেও শর্ত রাখা হয় যে, একই সময়ে দক্ষিণ বেরুবাড়ী সম্পূর্ণভাবে ভারতের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।পূর্বে এই করিডরটি দিনের মধ্যে মাত্র বারো ঘণ্টার জন্য উন্মুক্ত রাখা হতো। পরবর্তীকালে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী, করিডরটি চব্বিশ ঘণ্টাই খোলা রাখার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হয় এবং ওই বছরের অক্টোবর মাসে তা আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্তও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু দৃশ্যত চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকলেও তিনবিঘা করিডরের মূল প্রবেশদ্বার বা গেটের নিয়ন্ত্রণ ও চাবি আজও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দখলেই রয়ে গেছে। দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা সংগ্রাম কমিটির সম্পাদক রেজানুর রহমান রেজা এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকে তিনবিঘা করিডর এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আচরণ ও কড়াকড়ি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ দহগ্রামবাসীকে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে ফেলেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, দহগ্রামের সাধারণ মানুষ এই পথ দিয়ে বের হলেই তল্লাশির নামে পদে পদে বিএসএফের হাতে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হতে হয়। একজন প্রান্তিক কৃষক নিজের বাড়িতে গরু লালন-পালন করেও সঠিক সময়ে তা বাজারে বিক্রি করতে পারেন না, কারণ তিনবিঘা করিডর দিয়ে একটি গরু পার করতে গেলেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নানা রকম আইনি বিপত্তি ও বাধার মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক গরুর সিরিয়াল পাওয়ার নামেও সাধারণ কৃষকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ; প্রতি বছর বর্ষা মরশুমে তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙন ও বন্যার পানিতে দহগ্রাম ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়, যার ফলে এই ইউনিয়নের মূল ভূখণ্ডটি দিন দিন আরও ছোট হয়ে আসছে।দহগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দা ও পেশায় রাজমিস্ত্রি বশির উদ্দিন তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভারতের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা ভিআইপি এই তিনবিঘা করিডর অতিক্রম করলে দীর্ঘ সময়ের জন্য করিডরের মূল গেটটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা হয়। তারা কেবল ১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুসারে করিডরের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের স্বাধীনতা চান। একই সুর শোনা যায় স্থানীয় ইউপি সদস্য গোলাম রব্বানী এবং স্থানীয় বাসিন্দা মরিয়ম আখতারের কণ্ঠেও। মরিয়ম আখতার বলেন, ভারতীয় কোনো কর্মকর্তা এলে পূর্ব ঘোষণা বা নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ করে গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার ফলে প্রসূতি রোগী ও জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় গেটের সামনে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাদের জীবনের মূল্য যেন ভারতীয় বাহিনীর কাছে কিছুই না। অন্যদিকে চর সৈয়দপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মজিবর মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, তারা কাগজে-কলমে স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও কার্যত চরমভাবে বঞ্চিত ও অবরুদ্ধ হয়ে আছেন। পাটগ্রাম শহরের স্থানীয় হাটে বাজার করতে গেলে এবং বাড়ি ফেরার পথে দুই বার বিজিবি ও বিএসএফের কঠোর তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয়, যা তাদের স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা তুহিন মিয়ার মতে, বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রতি সপ্তাহে মাত্র ষাটটি গরু পারাপারের অনুমতি দেয় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী, যার ফলে অবিক্রীত পশুপাখি নিয়ে খামারিদের চরম আর্থিক লোকসান ও দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় বসবাসকারী ময়নূল হক সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গত মাত্র পাঁচ সপ্তাহের ব্যবধানে লালমনিরহাট সীমান্তে দুই জন নিরপরাধ বাংলাদেশি নাগরিককে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। যার মধ্যে সর্বশেষ গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে হাতীবান্ধা উপজেলার বনচৌকি সীমান্ত এলাকায় খাদেমুল ইসলাম নামের এক চব্বিশ বছর বয়সী বাংলাদেশি যুবককে ভোরে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে পাটগ্রাম সীমান্তে আলী হোসেন নামের আরও এক ব্যক্তি নিহত হন। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর থেকে এই সীমান্ত হত্যা ও নজরদারি আরও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ভারতকে বাৎসরিক মাত্র এক টাকা খাজনা দেওয়ার সম্মতিতে নিরুপায় হয়ে ৯৯ বছরের জন্য তিনবিঘা করিডরটি লিজ নিতে বাধ্য হয় এবং ওই বছরের জুন মাসে করিডরটি খুলে দেওয়া হয়। সম্প্রতি এই বার্ষিক খাজনার পরিমাণ বাড়িয়ে আড়াই টাকা করা হয়েছে। তবে চুক্তি অনুযায়ী করিডরের অভ্যন্তরে দুই পক্ষেরই কোনো ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করার কথা না থাকলেও, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী করিডরের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে দুটি পাকা চেকপোস্ট নির্মাণ করে রেখেছে। অথচ এই করিডরের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের বর্ডার গার্ডের হাতে থাকার কথা থাকলেও ভারত সরকার আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে আজও তা নিজেদের কুক্ষিগত করে রেখেছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল