প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
টেলিকমে যুগান্তকারী পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেন আইসিটি উপদেষ্টা
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ দেশের উদীয়মান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেছেন যে, দেশের সামগ্রিক টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বর্তমান সরকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারমূলক খাত বা থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে বিবেচনা করছে। এই রূপান্তরের অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে এই বিশেষ খাতের অবদান বর্তমান অবস্থা থেকে বাড়িয়ে একলাফে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার একটি সুনির্দিষ্ট ও বৈপ্লবিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। উপদেষ্টা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আরও যোগ করেন যে, বাংলাদেশ কেবল মোবাইল বা ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যার দিক থেকেই বড় হবে না, বরং আগামীতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সেবার মানের দিক থেকেও বিশ্বের প্রথম সারির শীর্ষ ২০টি দেশের তালিকায় নিজেদের স্থান সুনিশ্চিত করার একটি যুগান্তকারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। শনিবার রাজধানীর অভিজাত হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ বা টিআরএনবি কর্তৃক অত্যন্ত সাড়ম্বরে আয়োজিত ‘টেলিকম খাতের ভবিষ্যৎ: নতুন সরকার কী ভাবছে’ শীর্ষক একটি উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এই আশাব্যঞ্জক তথ্যগুলো সবার সামনে উন্মোচন করেন।অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্যকে আরও সম্প্রসারিত করে রেহান আসিফ আসাদ বলেন যে, বর্তমানে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বর্তমান দৃশ্যমান অবদান ১ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করে। তবে বর্তমান সরকার অত্যন্ত জোরালোভাবে বিশ্বাস করে যে, যদি সময়োপযোগী সঠিক নীতিমালা, উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণ এবং সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়, তবে এই খাতের অবদান বর্তমানের চেয়ে খুব সহজেই দ্বিগুণ কিংবা তিনগুণ বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। আর এই বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই আগামী পাঁচ বছরে জিডিপিতে ১৫ শতাংশ অবদান অর্জনের এই মহাপরিকল্পনাকে তিনি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং অর্জনযোগ্য বলে মনে করেন। তিনি আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জানান যে, বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বে মোবাইল ও ফিক্সড লাইনের সামগ্রিক গ্রাহকসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের প্রথম সারির শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যে অন্যতম একটি নাম হলেও, অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে সেবার মানের সূচকে দেশের বর্তমান অবস্থান আন্তর্জাতিক তালিকায় ৯০-এরও পরে রয়েছে। এই প্রতিকূল অবস্থানকে আমূল বদলে দিতেই আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সেবার মানের বৈশ্বিক সূচকে দেশের অবস্থান শীর্ষ ২০-এর ঘরে নিয়ে আসাকে নতুন সরকার নিজেদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেছে।টেলিকম খাতের বর্তমানের জটিল কর কাঠামো ও রাজস্ব নীতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উপদেষ্টা দেশের বিদ্যমান ব্যবস্থার একটি বড় বৈষম্য সবার সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান যে, বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরোপিত কার্যকর করের হার বর্তমানে প্রায় ৫৫ থেকে ৫৬ শতাংশের মতো আকাশচুম্বী, যা বিশ্বব্যাপী এই খাতের গড় করের হার ২২ শতাংশের তুলনায় অবিশ্বাস্য রকমের বেশি। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়েছে। তবে তিনি বাস্তব অর্থনৈতিক সংকটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের মোট কর ও জিডিপির অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মতো অত্যন্ত নগণ্য হওয়ায় হুট করে কোনো খাতের করের হার কমিয়ে দেওয়া সরকারের জন্য অত্যন্ত বড় একটি চ্যালেঞ্জ বা কঠিন কাজ। তারপরও সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ লাঘব করতে এবং আসন্ন জাতীয় বাজেটে গ্রাহকদের সর্বোচ্চ স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কর কাঠামোতে কিছু ইতিবাচক ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত দেন তিনি। এর পাশাপাশি দেশের কাঙ্ক্ষিত বিদেশি বিনিয়োগের মন্দাভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে উপদেষ্টা জানান যে, বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ও জিডিপির অনুপাত মাত্র শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশের মতো এক হতাশাজনক পর্যায়ে রয়েছে। এই অচলাবস্থা কাটাতে এবং দেশের টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করতে সরকার খুব শীঘ্রই একটি সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি নীতির পথনকশা বা রোডম্যাপ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। এর ফলে বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারের ভবিষ্যৎ নীতিমালার পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং পুঁজির সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।দেশে দ্রুত ৪জি এবং ৫জি প্রযুক্তির নেটওয়ার্ক পরিপুর্ণভাবে বিস্তার করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলো চিহ্নিত করতে গিয়ে উপদেষ্টা বলেন যে, বাংলাদেশে এখনো মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে আধুনিক স্মার্টফোন রয়েছে। এই হার অত্যন্ত কম হওয়ায় উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য সরকার দেশীয় মোবাইল উৎপাদনকারী কারখানাগুলোর সহায়তায় মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে উন্নতমানের আধুনিক স্মার্টফোন দেশের বাজারে সরবরাহ করার এক বিশেষ ও বড় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। একই সাথে দেশের সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষ যাতে অতি সহজে এবং কোনো বাড়তি আর্থিক চাপ ছাড়া সহজ কিস্তি বা ইএমআই সুবিধার মাধ্যমে এই সমস্ত ফোন কিনতে পারেন, সেজন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল অপারেটর এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সাথে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী আলোচনা অত্যন্ত সফলভাবে এগিয়ে চলছে। তরঙ্গের ব্যবহার বা স্পেকট্রাম নীতির বিষয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, সরকারের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কেবল স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ বিক্রি করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সাময়িক রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা নয়। বরং এই তরঙ্গের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর বহুমাত্রিক ও ইতিবাচক ডিজিটাল প্রভাব নিশ্চিত করাই এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। একই সাথে বর্তমানের বিশ্বায়নের যুগে ডেটা সেন্টার স্থাপন, কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, ক্লাউড অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সর্বস্তরের সাইবার নিরাপত্তাকে এখন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।বিশেষ করে সাইবার নিরাপত্তার বর্তমান ভঙ্গুর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে উপদেষ্টা বলেন যে, বর্তমানের নাজুক অবস্থান থেকে সুরক্ষার দিক দিয়ে বাংলাদেশকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দেশের সাধারণ গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, সরকারি সমস্ত গোপন নথি এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর সার্বিক সুরক্ষায় অতি দ্রুত আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো এখন সময়ের দাবি, যা বর্তমান সরকার তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় স্থান দিয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ আইটি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ নীতিগত সহায়তা প্রদান, সাশ্রয়ী কর্মপরিসর বা কো-ওয়ার্কিং স্পেসের ব্যবস্থা, বিশেষ সরকারি অনুদান এবং সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণসহ সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা বহুগুণ বাড়ানো হবে। এই পরিকল্পনার আওতায় একদম ছোট ও নতুন উদ্যোক্তাদের কয়েক লাখ টাকার প্রাথমিক তহবিল থেকে শুরু করে বড় ও প্রতিষ্ঠিত আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোর কোটি টাকার স্কেল-আপ বা ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বিশেষ আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।উপদেষ্টা অত্যন্ত আশাবাদের সাথে তাঁর বক্তব্য শেষ করে বলেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যার গড় বয়স মাত্র ২৭ বছর, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের জন্য এক বিশাল ও ঈর্ষণীয় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা যুবশক্তির আশীর্বাদ। দেশের এই বিশাল ও প্রাণবন্ত তরুণ জনগোষ্ঠী, তাদের প্রখর উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং উন্নত প্রযুক্তি দক্ষতাকে যদি রাষ্ট্র সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে আগামী মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে এই টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক বিপ্লব নিয়ে আসবে। তিনি ভবিষ্যৎ প্রাক্কলন করে বলেন যে, ২০৪৮ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে ট্রিলিয়ন ডলারের এক বিশাল ও শক্তিশালী অর্থনীতিতে পদার্পণ করতে পারে এবং দেশের এই অভাবনীয় অর্থনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতই সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক অনুঘটকের ভূমিকা পালন করবে। টিআরএনবির সম্মানিত সভাপতি সমীর কুমার দে’র অত্যন্ত চমৎকার ও সুচারু সঞ্চালনায় আয়োজিত এই বিশেষ সেমিনারে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য পেশ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। গোলটেবিলের মূল প্রবন্ধটি অত্যন্ত তথ্যবহুলভাবে উপস্থাপন করেন দেশের অন্যতম শীর্ষ মোবাইল অপারেটর রবির হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স সাহেদ আলম। এ সময় অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন দেশের নবনিযুক্ত ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল