প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬
স্ক্রিন আসক্তিতে শিশুদের মাথাব্যথা, চোখের সমস্যা ও ডায়াবেটিস ঝুঁকি বাড়ছে
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
‘আগে মোবাইল দাও, তারপর খাব’ কিংবা ‘মোবাইল না দিলে আমি কিচ্ছু খাব না’—এমন চাইল্ডিশ বা জেদি আবদার এখনকার প্রায় প্রতিটি ঘরেই চেনা দৃশ্য। সন্তানের এমন নাছোড়বান্দা আচরণের মুখে পড়ে মা-বাবা, ভাই-বোন কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যরাও অনেক সময় বাধ্য হয়ে শিশুর হাতে তুলে দেন আধুনিক জীবনের এক নীরব ঘাতক—স্মার্টফোন কিংবা ট্যাবের মতো ডিজিটাল ডিভাইস। আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় অবুঝ শিশুটিকে এক কৃত্রিম ডিজিটাল জগতে ধীরে ধীরে গ্রাস করার ভিন্ন ও ভয়ঙ্কর এক যাত্রা। সকালের সূচনা হয় বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে কার্টুন দেখার মধ্য দিয়ে আর রাত শেষ হয় তীব্র উত্তেজনাকর ভিডিও গেম খেলে। এভাবে শিশুদের পুরো বাস্তব জগতটা এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির একটি রঙিন পর্দায় বন্দি হয়ে যাচ্ছে। ঘরের কোণে বসে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় সে থালায় কী খাচ্ছে, তা নিজেও জানে না এবং জানার চেষ্টাও করে না। খাবারে পুষ্টিকর সবজি নাকি মাছ রয়েছে—সেদিকে তাদের বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ থাকে না।প্রকৃতপক্ষে, শিশুর কচি মস্তিষ্ক এখন আসল খাবারের স্বাদের চেয়ে স্ক্রিনের নীল আলো আর তীব্র যান্ত্রিক শব্দ থেকে পাওয়া কৃত্রিম আনন্দের প্রতি বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব হিসেবে খুব দ্রুতই তাদের শরীরে বাসা বাঁধছে তীব্র ক্ষুধামন্দা, স্থূলতা ও অনিদ্রার মতো জটিল সমস্যা। সারাক্ষণ উজ্জ্বল স্ক্রিনে চোখ রাখার কারণে অনেক শিশুই এখন চোখে ঝাপসা দেখছে এবং অল্প বয়সেই তাদের তীব্র মাথাব্যথা শুরু হচ্ছে। এর সঙ্গে বাড়তি রোগ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে ঘাড় ও পিঠের স্থায়ী ব্যথা। এই শারীরিক কষ্ট নীরবে সহ্য করেও শিশুরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টারও বেশি সময় ডিজিটাল স্ক্রিনের পেছনে ব্যয় করছে। বিভিন্ন অনলাইন ক্লাস, গেমস, বিনোদনমূলক ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগের পেছনেই তাদের এই অমূল্য সময় নষ্ট হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন নামী স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ওপর পরিচালিত আইসিডিডিআর,বি-এর এক গবেষণায় ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় কাটানোর এমন এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে তাদের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে।মোট ৬টি স্কুলের ৪২০ জন শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮৩ শতাংশ শিশুই দৈনিক সাড়ে চার ঘণ্টার বেশি সময় ডিজিটাল পর্দায় বুঁদ হয়ে থাকে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সময়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। এই গবেষণায় শিশুদের প্রধান ৯টি শারীরিক সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে, যা সরাসরি অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি সময় ফোন বা ট্যাব ব্যবহার করা শিশুদের মধ্যে চোখের জ্যোতি কমে যাওয়া, মাথাব্যথা, ঘাড়-পিঠের পেশিতে টান লাগা, ঘুমের মারাত্মক ব্যাঘাত এমনকি অল্প বয়সেই মোটা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩৫ শতাংশের বেশি শিশু চোখের নানাবিধ জটিলতায় এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু প্রতিনিয়ত মাথাব্যথায় ভুগছে। দীর্ঘ সময় একটানা চোখের পলক না ফেলে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের স্বাভাবিক বিশ্রাম বাধাগ্রস্ত হয় এবং চোখের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, যা সরাসরি মাথায় গিয়ে আঘাত করে।একইভাবে, মোবাইল ও ট্যাব ব্যবহারের সময় সোজা হয়ে না বসে কুঁজো বা বাঁকা হয়ে বসার কারণে শিশুদের ঘাড় ও পিঠে ব্যথার হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে মাথা নিচু করে দীর্ঘ সময় ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার এই বাজে অভ্যাস তাদের মেরুদণ্ডের হাড়ের ওপর অতিরিক্ত ও ক্ষতিকর চাপ তৈরি করছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৪৫ শতাংশ শিশুর ঘাড়ে এবং ৪০ শতাংশ শিশুর পিঠের মাংসপেশিতে স্থায়ী ব্যথা তৈরি হয়েছে। এই বিষয়ে চিকিৎসকেরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, এত অল্প বয়সে মেরুদণ্ডে চাপ পড়লে ভবিষ্যতে তা হাড়ের গুরুতর রোগ ও স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত শিশুদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো তাদের খাবারের নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি থাকছে না। বেশিরভাগ শিশুই স্ক্রিন দেখতে দেখতে যান্ত্রিকভাবে খাবার মুখে পুরছে। এর ফলে প্রায় ৬৫ শতাংশ শিশুর হজমের স্থায়ী সমস্যা এবং ৪৮ শতাংশ শিশুর তীব্র ক্ষুধামন্দা দেখা দিচ্ছে। খাবারের সময় স্ক্রিন দেখা মূলত মানুষের পাচনতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে সম্পূর্ণ ব্যাহত করে।গবেষণায় আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যে, প্রায় ৮১ শতাংশ বন্ধী শিশুই প্রায় সবসময় পেটব্যথায় ভুগে থাকে। চিকিৎসকেরা এক ১২ বছর বয়সী শিশুর উদাহরণ দিয়ে জানান, সেই শিশুটির তীব্র পেটব্যথার মূল কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, সে মোবাইল দেখার প্রতি এতটাই বুঁদ হয়ে থাকত যে, ঠিক সময়ে শৌচাগারে যেত না। অত্যন্ত ক্ষতিকর উপায়ে সে দীর্ঘ সময় ধরে তার মলমূত্র চেপে রাখত, যার কারণে তার শরীরে একপর্যায়ে ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন বা মূত্রনালির নিম্নভাগে মারাত্মক সংক্রমণ তৈরি হয়। এছাড়া হেডফোন বা ইয়ারফোনে উচ্চ শব্দে গান শোনা ও গেম খেলার ফলে প্রায় ৩ শতাংশ শিশুর মধ্যে শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়ার মতো নীরব ও স্থায়ী ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি, সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকার কারণে কোনো শারীরিক পরিশ্রম না হওয়ায় শিশুরা অল্প বয়সেই অস্বাভাবিক মোটা বা স্থূল হয়ে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে তাদের শরীরে ডায়াবেটিসের মতো বড় রোগের ঝুঁকি তৈরি করছে।সবচেয়ে নীরব ও মারাত্মক আঘাতটি আসে শিশুর ঘুমের ওপর। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের ঘুমাতে যেতে অনেক দেরি হয়, ফলে তাদের মোট ঘুমের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে যায় এবং রাতে বারবার কাঁচা ঘুম ভেঙে যায়। দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করা শিশুদের প্রায় অর্ধেকই প্রতিদিন ৭ ঘণ্টার চেয়েও কম ঘুমায়। ঘুমের এই তীব্র অভাব সরাসরি শিশুর হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে একদম দুর্বল করে দেয়। পর্যাপ্ত না ঘুমানোর ফলে শিশুরা খিটখিটে মেজাজের হয়ে উঠছে এবং পরিবারের সবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে। চিকিৎসকদের মতে, এটি আসলে একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়ার মতো; স্ক্রিন আসক্তি থেকে ঘুম কম হবে, ঘুম কম হলে স্থূলতা ও মানসিক বিকৃতি বাড়বে এবং এক সময় পুরো শরীর ভেঙে পড়বে। এটি এখন একটি নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে গবেষকেরা কিছু জরুরি সুপারিশ করেছেন; যার মধ্যে রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে শিশুর স্ক্রিন দেখার সময় সীমিত করা, ঘুমানোর অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা আগে সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস বন্ধ করে দেওয়া এবং শিশুদের বাইরে গিয়ে খেলাধুলা ও দৌড়ঝাঁপের পাশাপাশি বই পড়া বা পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়ার মতো সৃষ্টিশীল কাজে ব্যস্ত রাখা। সর্বোপরি, মা-বাবাকে তাদের সন্তানদের সঙ্গে আরও বেশি গুণগত ও আনন্দময় সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল