প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬
হটস্পট ৩০ উপজেলায় হাম সংক্রমণ হ্রাস
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
দেশজুড়ে সরকারের নেওয়া জরুরি ও বিশেষ হামের টিকাদান কার্যক্রমের সুদূরপ্রসারী এবং ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে মাঠপর্যায়ে। দেশের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বা অতি সংক্রমণপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত আঠারোটি জেলার ত্রিশটি উপজেলায় হামের ভয়াবহ প্রকোপ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করেছে। এই সকল প্রত্যন্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলের অধিকাংশ হাসপাতালেই এখন প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দুই অঙ্কের নিচে নেমে এসেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক খবর।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, প্রাথমিকভাবে রোগ ছড়ানোর উৎস হিসেবে চিহ্নিত যে সমস্ত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন জোরদার করা হয়েছিল, সেখানে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ এখন একেবারেই নিম্নমুখী। বিশেষ করে, গত পাঁচই এপ্রিল দেশজুড়ে যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছিল, তার আওতায় পাঁচ মাস থেকে শুরু করে উনষাট মাস বয়সি শিশুদের সফলভাবে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার পর থেকেই এই আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। টিকাদানের পর অতি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে নতুন করে শিশুদের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার হার রাতারাতি হ্রাস পেয়েছে।এই জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সামগ্রিক অগ্রগতি ও মাঠপর্যায়ের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান যে, গত পাঁচই এপ্রিল দেশের আঠারোটি জেলার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ত্রিশটি উপজেলাকে কেন্দ্র করে যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছিল, তার সুফল এখন দৃশ্যমান। বর্তমানে ওই সমস্ত নির্দিষ্ট এলাকায় নতুন করে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নেই বললেই চলে। মন্ত্রী আরও আশ্বস্ত করেন যে, কেবল এই নির্দিষ্ট হটস্পটগুলোতেই নয়, বরং সরকারি বিভিন্ন সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে বর্তমানে দেশের প্রতিটি প্রান্তেই হামের সার্বিক পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এদেশীয় প্রতিনিধি ডা. চিরঞ্জিত দাস এই সাফল্যের পেছনে টিকার বৈজ্ঞানিক কার্যকারিতাকে ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন যে, যেকোনো ভ্যাকসিনের পূর্ণ কার্যকারিতা শরীরে প্রকাশ পেতে সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত সময়ের প্রয়োজন হয়। মাঠপর্যায়ের উপাত্ত ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পাঁচই এপ্রিল থেকে বিশেষ টিকাদান শুরুর ঠিক দুই সপ্তাহ পর অর্থাৎ সতেরোই এপ্রিলের পর থেকেই ওই ত্রিশটি উপজেলায় নতুন করে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমতে শুরু করে। বর্তমানে সেখানে নতুন রোগী পাওয়ার ঘটনা বিরল। এই ইতিবাচক ফলাফলই প্রমাণ করে যে সরকারের এই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি কতটা সময়োপযোগী ও কার্যকর ছিল। একই ধরনের সুফল দেশের পাঁচটি বড় সিটি করপোরেশন এলাকাতেও দেখা যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, সামগ্রিকভাবে দেশে এখন হামের কারণে শিশু মৃত্যুর হার সম্পূর্ণ স্থিতিশীল এবং নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে টিকাদান কর্মসূচির শতভাগ দীর্ঘমেয়াদি সুফল পুরোপুরি ঘরে তুলতে আমাদের আরও কয়েক সপ্তাহ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে, কারণ যেকোনো শিশুর শরীরে এই টিকা দেওয়ার পর পুরোপুরি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত তিন থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসও একই সুর মিলিয়ে জানান, প্রাথমিক পর্যায়ের এই টিকাদান ক্যাম্পেইনের ফলেই সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত এলাকার শিশুদের বড় একটি অংশকে এই মারাত্মক রোগের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাঠানো সংবাদদাতার প্রতিবেদনেও এই আশাব্যঞ্জক চিত্রের প্রতিফলন ঘটেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মাত্র দুইজন এবং ফেব্রুয়ারি মাসে পাঁচজন হামের রোগী জেলা হাসপাতালে ভর্তি হলেও মার্চ মাসে এসে হঠাৎ করেই এই রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকে। এপ্রিলের শুরুর দিকে পরিস্থিতি প্রায় মহামারীর রূপ ধারণ করে এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় একশত রোগী পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হতে শুরু করে। তবে সরকারের বিশেষ টিকাদানের পর বর্তমানে হাসপাতালটিতে প্রতিদিন মাত্র আট থেকে দশজন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাব উদ্দীন এবং জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মশিউর রহমান যৌথভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ের রোগী ভর্তির এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় জেলাটিতে হামের প্রকোপ এখন সম্পূর্ণ নিম্নমুখী।একইভাবে নাটোর জেলা থেকে পাওয়া সংবাদে জানা গেছে, জেলার সদর উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। বর্তমানে সেখানে হামের কোনো উপসর্গ নিয়ে শিশুর মৃত্যু বা বড় ধরনের কোনো শারীরিক জটিলতার খবর পাওয়া যায়নি। নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমান জানান, সদর উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ শিশুকেই এই বিশেষ টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, যার ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি এলাকায় হামের প্রকোপও শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। পাশাপাশি এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতাও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এদিকে পাবনার সিভিল সার্জন মো. আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, পাবনাতেও এখনও কিছু শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে সত্য, তবে সেই সংখ্যাটি আগের তুলনায় নগণ্য। গত মার্চ মাসেও যেখানে প্রতিদিন ১৯ থেকে ২১ জন হামের রোগী জেলা সদর হাসপাতালে কাতরাতো, সেখানে বিশেষ টিকাদানের ছোঁয়ায় বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র ৮ থেকে ১০ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে। চিকিৎসকদের মতে, এই ধারা বজায় থাকলে খুব দ্রুতই দেশ থেকে হামের এই সাময়িক প্রকোপ পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল