প্রিন্ট এর তারিখ : ১৯ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
হামের চিকিৎসায় হিমশিম, চাপে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
দেশের নিম্নবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর ওপর বড় আঘাত হয়ে এসেছে হামের প্রাদুর্ভাব। এই সংক্রামক রোগের চিকিৎসা খরচ মেটাতে গিয়ে রীতিমতো নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার পেছনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার একটি বড় অংশই চলে যাচ্ছে মূল চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও হাসপাতাল ঘোরার পেছনে। এর ওপর আবার যোগ হয়েছে কিছু হাসপাতালের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। সাধারণ হামে আক্রান্ত শিশুকে গুরুতর অসুস্থ কিংবা আশঙ্কাজনক আখ্যা দিয়ে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী অভিভাবকরা। পরে অন্য হাসপাতালে নিয়ে পরীক্ষা করার পর দেখা যাচ্ছে শিশুর অবস্থা একেবারেই স্বাভাবিক। চিকিৎসা ব্যবস্থার এমন সমন্বয়হীনতা ও হয়রানির কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ রোগাক্রান্ত মানুষের স্বজনরা।সোমবার (১৮ মে) ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতাল বা বিশেষায়িত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় নিম্নবিত্ত মানুষের এই করুণ চিত্র। সেখানে চিকিৎসাধীন মরিয়ম নামের মাত্র এগারো মাস বয়সি এক শিশুর গল্পটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ছোট্ট এই শিশুটি প্রথমে টানা চৌদ্দ দিন ফুসফুসের মারাত্মক সংক্রমণ বা নিউমোনিয়ায় ভুগে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। সেই ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার হামের জীবাণুর ছোবলে পড়ে গত পাঁচ দিন ধরে এই বিশেষায়িত হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছে। তার এই দীর্ঘদিনের চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে নাতনির দাদি ছকিনা বেগমের জীবনের শেষ সম্বলটুকুও শেষ হয়ে গেছে। তিনি চোখের পানি মুছে জানান, জমানো সব টাকা ও ঘটিবাটি বিক্রি করে নাতনিকে সুস্থ করার চেষ্টা করছেন। এখন হাসপাতাল থেকে শিশুটি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার ছাড়পত্র পেলেও, স্রেফ বাড়ি ফেরার যাতায়াত ভাড়া না থাকায় তারা হাসপাতাল ছাড়তে পারছেন না।এই বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অধিকাংশ সাধারণ ও গরিব পরিবারের গল্পই মোটের ওপর একই রকম। সংসারের একমাত্র উপার্জন দিয়ে যেখানে ডাল-ভাত জোগানো দায়, সেখানে ওষুধের চড়া দাম আর বাড়তি খরচের বোঝা নিম্নবিত্তদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে রোগী পাঠানোর বা স্থানান্তরের কালচার। স্বজনদের অভিযোগ, অনেক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল একটু জটিল লক্ষণ দেখলেই রোগীকে ভর্তি না রেখে বা প্রাথমিক চিকিৎসা না দিয়ে অন্য বড় হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। অনেক সময় শিশুর অবস্থা স্বাভাবিক থাকার পরও অযথা আতঙ্ক তৈরি করে রেফার করা হচ্ছে, যা তাদের আর্থিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।এই সার্বিক পরিস্থিতি ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিশেষায়িত হাসপাতালের মুখপাত্র চিকিৎসক আসিফ হায়দার জানান, অনেক হাসপাতাল থেকে রোগীদের একদম শেষ মুহূর্তে কিংবা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় এখানে পাঠানো হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গা ঘুরে যখন রোগীরা জটিল রূপ নিয়ে আমাদের এখানে পৌঁছায়, তখন চিকিৎসকদের আর তেমন কিছু করার থাকে না। আর এই বিলম্বের কারণেই মূলত মৃত্যুর ঘটনাগুলো বেশি ঘটছে। তিনি দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের হাসপাতালগুলোর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, সামান্য হামের লক্ষণ দেখলেই রোগীদের বড় হাসপাতালে না পাঠিয়ে শুরুতেই লক্ষণভিত্তিক সাধারণ চিকিৎসা দেওয়া উচিত। এতে করে রোগীদের ভোগান্তি ও মৃত্যুহার দুটোই অনেক কমে আসবে।চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা আরও জানাচ্ছেন, যে সমস্ত শিশুরা আগে থেকেই তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, হামে আক্রান্ত হলে তাদের অবস্থা দ্রুত খারাপ হচ্ছে। এসব শিশুদের ক্ষেত্রে খুব দ্রুত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউর প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে, যেসব সচেতন অভিভাবক রোগের শুরুতেই কোনো বিলম্ব না করে শিশুকে চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালে নিয়ে আসছেন, তারা খুব অল্প খরচেই এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারছেন। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার ওপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল