প্রিন্ট এর তারিখ : ২০ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬
ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে ওয়াশিংটন? ইঙ্গিত ট্রাম্পের
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ইরানের সঙ্গে একটি নতুন পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছানোর খুব ভালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক দাবি করে বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা ও সমঝোতার সুযোগ তৈরি করতেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর পূর্বনির্ধারিত সামরিক হামলা আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি বিশেষ প্রতিবেদন থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই নতুন রাজনৈতিক উত্তাপের খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা শেষ মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ জানান। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই মুহূর্তে সামরিক পথে না গিয়ে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখা এবং নির্ধারিত হামলাটি পিছিয়ে দেওয়া হোক। মিত্র দেশগুলোর এই কূটনৈতিক অনুরোধে সাড়া দিয়েই ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সাময়িকভাবে পিছু হটেছে। তবে ট্রাম্পের এই নরম সুরের আড়ালে কঠোর হুঁশিয়ারিও লুকিয়ে রয়েছে। তিনি পরিষ্কার ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যদি চলমান কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কোনো টেকসই সমঝোতা বা চুক্তি সম্ভব না হয়, তবে ইরানকে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে তেহরানের ওপর যেকোনো সময় আরও বড় পরিসরে একযোগে শক্তিশালী সামরিক অভিযান চালাতে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার এই নতুন অবস্থানের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে চলমান সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর অত্যন্ত ইতিবাচক ও উজ্জ্বল সম্ভাবনা এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে। তিনি ব্যক্তিগতভাবেও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের চেয়ে শান্তির পক্ষেই মত দিয়ে জানান, যদি কোনো ধরনের আকাশযান বা বোমা হামলা ছাড়াই এই সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করা যায়, তবে তিনি সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন। তবে ওয়াশিংটনের এই নতুন নমনীয়তার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের পুরো ভূ-রাজনীতির গভীর হিসাব-নিকাশ জড়িত রয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।দুই দেশের এই দীর্ঘদিনের বিরোধের পটভূমি ঘাঁটলে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ওপর একটি বড় আকারের বিমান হামলা শুরু করেছিল। এর তীব্র পাল্টা জবাবে তেহরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। তারা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক ঘাঁটি এবং কৌশলগত অবস্থানগুলোকে লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করলে গত এপ্রিল মাসে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষই একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে বাধ্য হয়। যদিও চুক্তি পরবর্তী সময়েও দুই দেশের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ছোটখাটো হামলার ঘটনা ঘটেছে, তবে বড় কোনো যুদ্ধ ছাড়াই সেই যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন পর্যন্ত কোনোমতে টিকে রয়েছে।কিন্তু দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থা কাটানোর জন্য রাজনৈতিক স্তরে আলোচনা খুব একটা এগোয়নি। আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবারই তেহরানে নতুন করে সর্বাত্মক হামলার হুমকি দিয়ে আসছিলেন। ওয়াশিংটনের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে ব্যাপক উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। তেলসমৃদ্ধ প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর গভীর আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর নতুন করে কোনো বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তবে ইরানও নিশ্চিতভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের ওপর প্রতিশোধ নেবে। সে ক্ষেত্রে তেহরান আবারও তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর বেসামরিক বিমানবন্দর, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও তেল শোধনাগার স্থাপনা এবং জীবন রক্ষাকারী লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোতে পাল্টা আঘাত হানতে পারে। এই অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ট্রাম্পকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার জোর অনুরোধ জানিয়েছিল, যার সুবাদেই আপাতত স্থগিত হলো মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধবিমান।তথ্যের মূল উৎস: রয়টার্স
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল