প্রিন্ট এর তারিখ : ২০ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬
বাণিজ্য চুক্তির জটিলতায় অর্থনৈতিক চাপের আশঙ্কা
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে যদি অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে কর বা রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ আশানুরূপভাবে বৃদ্ধি না করা যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিটিই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এক বিশাল ও অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করবে। দেশের উন্নয়ন বাজেট বা উন্নয়নমূলক কাজের পরিধি বাড়াতে হলে যেকোনো মূল্যে সরকারের কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে কর আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে রাজস্ব আহরণের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন অযোগ্য এবং এটি এখনো পুরোনো আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই করা হচ্ছে বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদেরা। গতকাল রাজধানীর গুলশানের একটি অভিজাত হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক প্রাক-বাজেট সংলাপে বক্তারা এসব চাঞ্চল্যকর ও নীতিগত মন্তব্য করেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এই সংবাদের বিস্তারিত জানা গেছে।নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য মো. সাইফুল আলম খান মিলন ও মাহমুদা হাবীবা। অনুষ্ঠানে আরও অংশ নেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি এবং নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হকসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা।মূল প্রবন্ধে সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, অভ্যন্তরীণ খাত থেকে কর আদায়ের পরিমাণ না বাড়িয়ে যদি শুধু সরকারের পরিচালন ব্যয় বা দৈনন্দিন খরচ বাড়ানো হয়, তবে তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, কর আদায় না বাড়লে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বিশেষ বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশ আবদ্ধ হয়েছে, সেটিও শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্য বড় ধরনের ঋণের বোঝা ও চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সংলাপের আরেক বক্তা অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জাতীয় বাজেটে সাধারণ জনগণ রাষ্ট্রকে ঠিক কতটা কর দিচ্ছে এবং তার বিনিময়ে রাষ্ট্র থেকে কতটুকু নাগরিক সুবিধা ফেরত পাচ্ছে, সেটির একটি নিরপেক্ষ ও সঠিক মূল্যায়ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে জনগণের ট্যাক্সের টাকা নিয়ে সরকারি পর্যায়গুলোতে ঠিক কতটা দুর্নীতি হচ্ছে, তা পরিমাপের ব্যবস্থা থাকা দরকার। তিনি একটি উদ্বেগজনক তথ্য দিয়ে বলেন, আগামী বাজেটে সরকারকে কেবল পূর্ববর্তী ঋণের সুদ পরিশোধের খাতেই প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এই সর্বনাশা ঋণনির্ভরতা যেকোনো মূল্যে কমিয়ে আনতে হবে।সভাপতির বক্তব্যে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অবাস্তব ও কাল্পনিক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং অতিরিক্ত উন্নয়ন ব্যয়ের বড় বড় পরিকল্পনা দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও বেশি চাপের মুখে ফেলে দিতে পারে। দেশ বর্তমানে নানান ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অথচ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার তিন মাস পার হয়ে গেলেও দেশের অর্থনীতিকে তারা ঠিক কী অবস্থায় পেয়েছে, তার কোনো আনুষ্ঠানিক বা প্রামাণ্য শ্বেতপত্র বা মূল্যায়ন এখনো জনগণের সামনে প্রকাশ করেনি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সরকার ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড কিংবা গ্রামীণ খাল খননের মতো জনপ্রিয় ও ছোট ছোট কর্মসূচি নিয়ে বেশি মাতামাতি করলেও দেশের মূল অর্থনৈতিক সংকট যেমন—অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি ঠেকানো, ব্যাংকের সুদের হার কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা কিংবা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো বড় বড় বিষয়গুলো নীতিনির্ধারকদের মনোযোগের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।তবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. জাহিদ হোসেন সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, বর্তমান প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা। যেখানে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও দরিদ্র মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার চাদরে এনে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা হবে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, আগামী অর্থবছর থেকেই পর্যায়ক্রমে সারা দেশে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি অত্যন্ত সুচারুভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এদিকে পোশাক খাতের ব্যবসায়ী নেতা মো. ফজলুল হক পরামর্শ দিয়ে বলেন, খাতভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ অন্ধভাবে না বাড়িয়ে ব্যয়ের গুণগত মান বা কোয়ালিটির ওপর জোর দেওয়া উচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, বরাদ্দ বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবায়নের মধ্যে এক বিশাল তফাত থেকে যায় এবং এর মাঝখানের সুযোগে বড় অঙ্কের দুর্নীতি হয়। তাই বরাদ্দ না বাড়িয়ে কোয়ালিটি বজায় রেখে স্বচ্ছতার সাথে ব্যয় করলে বাজেট ঘাটতি এমনিতেই কমে আসবে।উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান দেশের সাধারণ মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলেন, বাজারে মূল্যস্ফীতি যেভাবে বেড়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের কষ্ট চরমে পৌঁছেছে। এই কষ্ট লাঘব করতে আগামী বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক বা ট্যাক্স এক ধাক্কায় অনেকটা কমিয়ে আনা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি তিনি সরকারকে দেশের জ্বালানি তেলের দাম আর না বাড়ানোর জোর পরামর্শ দেন। ক্যাব সভাপতির এই বক্তব্যের সূত্র ধরে জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. সাইফুল আলম খান মিলনও সহমত প্রকাশ করেন এবং বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার পেছনে মাঠপর্যায়ের অবৈধ চাঁদাবাজির যে ব্যাপক প্রভাব রয়েছে, তা কঠোর হস্তে দমন করার জন্য বাজেটে বিশেষ দিকনির্দেশনা রাখার আহ্বান জানান।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল