প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬
আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় আনতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের গোপন তৎপরতার দাবি
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন শুরুর প্রাথমিক দিনগুলোতে ইসরাইলি বিমান হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতাসহ শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতারা নিহত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক জনসমক্ষে মন্তব্য করেছিলেন, ইরানের ভেতর থেকেই যদি ‘কেউ একজন’ এসে দেশের হাল ধরেন, তবে তা হবে সবচেয়ে উত্তম। ট্রাম্পের এই রহস্যময় মন্তব্যের আড়ালে যে এক গভীর ভূরাজনৈতিক ছক লুকিয়ে ছিল, তা অবশেষে প্রকাশ পেয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, যুদ্ধ শুরুর মুহূর্তে ওয়াশিংটন এবং তেলআবিবের মাথায় ইরানের শাসনভার তুলে দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ নাম সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত ছিল। তিনি আর কেউ নন, খোদ ইরানের সাবেক কট্টরপন্থী এবং একসময়ের তীব্র মার্কিন ও ইসরাইলবিরোধী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ।আন্তর্জাতিক মহলে এই তথ্যটি চরম বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে, কারণ ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন এই আহমাদিনেজাদই ইসরাইলকে পৃথিবীর ‘মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার’ হুঙ্কার দিয়েছিলেন এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইসরাইলের তৈরি করা এই দুঃসাহসিক ও কল্পনাতীত পরিকল্পনার বিষয়ে আহমাদিনেজাদের সাথে আগে থেকেই গোপনে এক ধরনের পরামর্শ করা হয়েছিল। তবে তেহরানের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেওয়ার এই মহাপরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত চরমভাবে ব্যর্থ হয়। মার্কিন গোয়েন্দা নথির বিবরণ অনুযায়ী, যুদ্ধের একদম প্রথম দিন তেহরানে আহমাদিনেজাদের ব্যক্তিগত বাসভবনে ইসরাইলি বিমানবাহিনী একটি বিশেষ হামলা চালায়। তবে এই হামলার উদ্দেশ্য তাকে হত্যা করা ছিল না, বরং তাকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের কঠোর গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা ছিল। মূলত একটি ‘জেলব্রেক’ বা বন্দি মুক্তির মিশন হিসেবে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো সেখানে বোমাবর্ষণ করে। ওই হামলায় তাকে পাহারা দেওয়া ইরানি রক্ষীরা নিহত হলেও আহমাদিনেজাদ অলৌকিকভাবে সামান্য আহত হয়ে বেঁচে যান। কিন্তু নিজের বাড়ির ওপর এমন ভয়াবহ তাণ্ডব দেখার পর বিদেশি শক্তির সহায়তায় ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের এই পরিকল্পনা নিয়ে তার সম্পূর্ণ মোহভঙ্গ হয় এবং এর পর থেকে তিনি নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেন।হোয়াইট হাউসের উচ্চপদস্থ মুখপাত্র অ্যানা কেলি এই সুনির্দিষ্ট সরকার পরিবর্তনের ছক ও আহমাদিনেজাদ প্রসঙ্গে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র লক্ষ্যগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও সফল ছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া, নৌবাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করা এবং তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে শতভাগ লক্ষ্য অর্জন করেছে। যুদ্ধের প্রথম দিনই সেন্ট্রাল তেহরানের একটি সুরক্ষিত ভবনে ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওই একই হামলায় ইরানের সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকও ধ্বংস হয়ে যায়, যেখানে হোয়াইট হাউসের চিহ্নিত করা এমন কিছু ইরানি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন যারা আমেরিকার সাথে একটি সমঝোতা ও সরকার পরিবর্তনের আলোচনায় আগ্রহী ছিলেন। তাদের আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিকল্পনাটি শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ে।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আহমাদিনেজাদের কিছু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও গতিবিধি বিশ্লেষণ করলে এই গোপন পরিকল্পনার অনেক যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার দুর্নীতি ও কুশাসনের তীব্র সমালোচনা করে আসছিলেন, যার খেসারত হিসেবে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রতিটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দেশটির রক্ষণশীল গার্ডিয়ান কাউন্সিল তার প্রার্থিতা বাতিল করে দেয়। এছাড়া তার সাবেক প্রধান স্টাফের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালেই পশ্চিমা ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছিল। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আহমাদিনেজাদ গুয়াতেমালা ও হাঙ্গেরির মতো এমন কিছু দেশ সফর করেছিলেন, যাদের সাথে ইসরাইলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। মূলত ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পরিকল্পনা ছিল—একযোগে বিমান হামলা চালিয়ে সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা, দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং কুর্দি বিদ্রোহীদের মাঠে নামিয়ে দেশজুড়ে এক ধরনের কৃত্রিম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করা। এর পর এই অরাজক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আহমাদিনেজাদের নেতৃত্বে একটি ‘বিকল্প সরকার’ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বিমান হামলা ও খামেনিকে হত্যার বাইরে এই পরিকল্পনার বাকি অংশগুলো বাস্তবায়নে মার্কিন ও ইসরাইলিরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, যা মূলত ইরানের অভ্যন্তরীণ সামাজিক স্থিতিস্থাপকতা বুঝতে পশ্চিমাদের চরম ব্যর্থতাকেই প্রমাণ করে। তাসত্ত্বেও মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া এখনো দাবি করছেন, পরিকল্পনাটি পুরোপুরি বাস্তবায়নের অনুমোদন পেলে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস চিরতরে বদলে যেত।মূল সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল