প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
দাদা-দাদির কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শিশু রামিসা
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকায় মাত্র আট বছরের এক নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণের পর যেভাবে নির্মম ও পাশবিক কায়দায় হত্যা করা হয়েছে, তা দেশের মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। পৈশাচিক এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী রামিসা আক্তারের মরদেহ শেষ পর্যন্ত তার আদি বাড়ি মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে গভীর রাতে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাদা-দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় এই অবোধ শিশুকে। বুধবার রাত সাড়ে আটটার দিকে যখন ঢাকা থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে শিশুটির নিথর দেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের আহাজারি আর গ্রামবাসীদের চোখের জলে পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এই অকাল ও নৃশংস মৃত্যুতে পুরো গ্রাম যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। রাত সাড়ে নয়টার দিকে স্থানীয় একটি মাঠে জানাজা সম্পন্ন হওয়ার পর মধ্য শিয়ালদী গ্রামের মোল্লাবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। জানাজায় রামিসার আত্মীয়-স্বজন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ অংশ নিয়ে এই জঘন্য অপরাধের তীব্র নিন্দা জানান। কবর দেওয়ার সময় শিশুটির বাবা ও অন্য স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়লে উপস্থিত কেউই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।এই নির্মম ও রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মুন্সিগঞ্জ শহরের রাস্তায় নেমে এসেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। রাতের অন্ধকারে মশাল জ্বালিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন তারা, যেখানে একটাই দাবি ছিল—পিশাচদের যেন কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া না হয় এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জানা গেছে, রামিসাকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা বুধবার দুপুরে আদালতে হাজির হয়ে নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। একই সাথে এই জঘন্য অপরাধে সহায়তাকারী ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে জানা গেছে, গত সোমবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে রামিসা নিজের বাসা থেকে বের হয়েছিল। পূর্বপরিকল্পনা বা কুচক্রী চিন্তাভাবনা থেকে স্বপ্না আক্তার কৌশলে মিষ্টি বা অন্য কোনো প্রলোভন দেখিয়ে ওই নিষ্পাপ শিশুকে নিজেদের ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে যান। সকাল সাড়ে দশটার দিকে যখন রামিসাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার পরিবারের সদস্যরা চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন, তখন কোথাও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে সন্দেহবশত অভিযুক্তদের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে শিশুটির জুতো পড়ে থাকতে দেখেন তারা। এরপর ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে স্বজন ও প্রতিবেশীরা সম্মিলিতভাবে দরজা ভেঙে ঘরের ভেতর প্রবেশ করেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে; ঘরের ভেতর শিশুটির খণ্ডিত ও রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে সবার বুক ফেটে যায়।জনতার তৎপরতায় ঘটনাস্থল থেকেই স্বপ্না আক্তারকে হাতেনাতে আটকে ফেলা সম্ভব হলেও, মূল অপরাধী সোহেল রানা ঘরের জানালার গ্রিল কেটে কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। অবশ্য তার এই পালিয়ে থাকা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; পুলিশের বিশেষ তৎপরতায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই পৈশাচিক ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন, যেখানে সোহেল রানা, স্বপ্না আক্তার এবং আরও এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, শিশুটিকে যখন ওই ফ্ল্যাটে আটকে রাখা হয়েছিল, তখন সেখানে তৃতীয় আরেকজন ব্যক্তির উপস্থিতি ছিল, যিনি প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে ঢোকার ঠিক আগ মুহূর্তে পেছনের পথ দিয়ে পালিয়ে যান। বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করায় মামলার তদন্ত আরও জোরদার হয়েছে। নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসীর এখন একটাই মাত্র চাওয়া, আর তা হলো এই জঘন্য ও পাশবিক হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল