প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
পদ্মার পর তিস্তাতেও ব্যারাজ পরিকল্পনা, বড় জলব্যবস্থাপনা উদ্যোগে সরকার
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
দেশের পানির নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত বিপর্যয় রুখতে এক যুগান্তকারী ও দূরদর্শী ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, বছরের পর বছর ধরে মাটির নিচ থেকে যেভাবে অবাধে ভূগর্ভস্থ পানি টেনে ওপরে তোলা হচ্ছে, তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চরম বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সুপেয় ও প্রয়োজনীয় পানির জোগান নিশ্চিত করতে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে সরকার এখন অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে পরিবেশের সুরক্ষায় বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের পাশাপাশি এবার তিস্তা ব্যারাজের কাজেও সরকার সরাসরি হাত দেবে বলে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। গতকাল বুধবার গাজীপুরের টঙ্গীতে নবনির্মিত জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনের ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী ভাষণে তিনি এই সব জীবনমুখী কথা বলেন। এই অনুষ্ঠানের আগে প্রধানমন্ত্রী সকালে কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুরে অবস্থিত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশে যোগ দেন এবং সেখানে উপস্থিত দেশপ্রেমিক বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।সফিপুরের দৃষ্টিনন্দন আনসার-ভিডিপি একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত সেই বিশাল সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, গভীর নিষ্ঠা, কঠোর শৃঙ্খলা, নিখুঁত পেশাদারিত্ব এবং অকৃত্রিম দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে এই বাহিনী আগামী দিনে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, মানবিক ও সামাজিক বাহিনী হিসেবে দেশের মানুষের সামনে আত্মপ্রকাশ করবে। তিনি বাহিনীর কর্মকর্তাদের মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, যে কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর মূল ভিত্তিই হলো চেইন অব কমান্ড বা আদেশানুক্রম এবং ডিসিপ্লিন বা শৃঙ্খলা মেনে চলা। এই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যদি সামান্যতম অবহেলা বা গাফিলতি থাকে, তবে কোনো বাহিনীই কখনো প্রকৃত অর্থে সুশৃঙ্খল ও জনবান্ধব বাহিনী হয়ে উঠতে পারে না। শৃঙ্খলার মধ্যে বিন্দুমাত্র ঘাটতি দেখা দিলে সেই বাহিনী সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে এক বিরাট আস্থার সংকট তৈরি হয়, যা দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য কখনোই কাম্য নয়। তবে পেশাদারিত্ব, সরাসরি জনসম্পৃক্ততা এবং একদম তৃণমূল পর্যায়ে নিরাপত্তা ও সামাজিক উন্নয়নে অভূতপূর্ব অবদানের মাধ্যমে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী বর্তমানে একটি বহুমাত্রিক ও জনমুখী শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষাকারী শক্তিতে পরিণত হয়েছে।বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী জটিল ও নাজুক পরিস্থিতির কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সেই ক্রান্তিলগ্নে যখন পুলিশ বাহিনী মাঠে ছিল না, তখন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাহসী সদস্যরা বিভিন্ন থানা পাহারা দেওয়া, রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থা দক্ষতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করা এবং দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার এই গুরুদায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এই বাহিনীর সদস্যরা সমাজে নানামুখী সচেতনতা সৃষ্টি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। ব্যাটালিয়ন আনসার, অঙ্গীভূত আনসার, থানা বা উপজেলা পর্যায়ের আনসার এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা দলের প্রতিটি স্তরের জনশক্তি আজ সমন্বিতভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা এবং গ্রামীণ আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এই শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণেই বাহিনীটি আজ দেশের কেন্দ্র থেকে শুরু করে একদম প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত একটি প্রধানতম চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বড় বড় শিল্পকারখানা এবং দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাল্যবিয়ে রোধ করা, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করা এবং সমাজ থেকে মাদকের করাল গ্রাস দূর করাসহ নানা প্রশংসনীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডে তারা অবদান রাখছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বাহিনীর গৌরবময় অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রায় ৪০ হাজার আনসার সদস্য নিজেদের সাধারণ রাইফেল হাতে নিয়ে বীরত্বের সাথে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং লড়াই করতে গিয়ে এই বাহিনীর ৬৭০ জন অকুতোভয় সদস্য শহীদ হয়েছেন। জাতি তাদের এই মহান আত্মত্যাগ চিরকাল পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। মূল বক্তব্য শেষ করার পর প্রধানমন্ত্রী একাডেমির ভেতরে বাহিনীর সদস্যদের পরিচালিত ঐতিহ্যবাহী তাঁত ও বুনন শিল্প, মৃৎশিল্প, গবাদি পশুর আধুনিক খামার এবং জাপানি ভাষা শিক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সশরীরে ঘুরে দেখেন এবং তাদের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন।এরপর দুপুরবেলা গাজীপুরের ধরপাড়ার সাতাইশ চৌরাস্তা এলাকায় জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনের ফলক উন্মোচনকালে দেশের পরিবেশগত সংকট নিয়ে এক চুলচেরা বিশ্লেষণ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিগত বছরগুলোতে দেশের মাটির নিচ থেকে যে বিপুল পরিমাণ পানি পাম্পের মাধ্যমে ওপরে তুলে ফেলা হয়েছে, তা এতটাই আশঙ্কাজনক যে আমাদের নদী-নালা, খাল-বিল নতুন করে খনন করার পর এবং বর্ষা মৌসুমের উপচে পড়া অতিরিক্ত পানি যদি আমরা কৃত্রিম উপায়ে মাটির নিচে ছড়িয়েও দিই, তবুও আগামী ২০ বছরের মধ্যে সেই শূন্যস্থান পূরণ বা রিচার্জ হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর আমাদের এই অতিরিক্ত নির্ভরতা আগামী দিনে এক ভয়ংকর পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনবে। এই প্রাকৃতিক সংকট থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে আমাদের ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে, আর সে কারণেই বিএনপি সরকার পদ্মা ও তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে বিশাল ব্যারাজ বা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ফসলি জমি কমে ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজসহ নানা অবকাঠামো গড়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে পরিকল্পিতভাবে খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু করা হবে, যা একদিকে যেমন কৃষিকাজে সেচের পানির জোগান দেবে, অন্যদিকে দেশের মানুষের খাদ্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, খাল খনন কেবল কোনো রাজনৈতিক বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি দেশের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় পদক্ষেপ।এই জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দেশের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এটিএম শামসুল ইসলাম এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ বিভিন্ন এলাকার সংসদ সদস্য এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী আনসার একাডেমিতে পৌঁছালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। প্রধানমন্ত্রী প্রথমে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরবর্তীতে দুপুরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর সভাপতিত্বে এবং প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইনের উপস্থিতিতে নতুন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ফলক উন্মোচন শেষে প্রধানমন্ত্রী প্রাঙ্গণের একটি পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন এবং একটি ফলদ ও ঔষধি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল