প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
হরমুজের বিকল্প পথ গড়তে অগ্রসর আমিরাত, অর্ধেক কাজ শেষ বলে দাবি
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ চরম ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালীর ওপর থেকে নিজেদের চিরন্তন নির্ভরতা কমিয়ে আনতে এক অভাবনীয় এবং বিশাল কৌশলগত অগ্রগতি অর্জন করেছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের নিরাপত্তা চিরতরে নিশ্চিত করতে দেশটি তাদের পশ্চিম উপকূল থেকে শুরু করে পূর্ব উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সম্পূর্ণ নতুন ও বিশালাকার তেল পাইপলাইন প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে চলেছে, যার প্রায় ৫০ শতাংশ নির্মাণকাজ ইতিমধ্যেই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান চরম উত্তেজনাকর এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই পাইপলাইনটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য এক নতুন জীবনরেখা হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। মূলত ইরান নিয়ন্ত্রিত ও সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালীকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে সরাসরি ওমান উপসাগরের উন্মুক্ত জলসীমায় নিজেদের উৎপাদিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পৌঁছে দেওয়াই হচ্ছে আমিরাত প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। এই প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধ বা সংকটের প্রভাব ফেলার সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে।সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিল্প ও উন্নত প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী এবং আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির প্রধান নির্বাহী পরিচালক ড. সুলতান আহমেদ আল জাবের এই মেগা প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়ে বিশ্ববাসীকে এক দারুণ সুখবর দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এই কৌশলগত প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করা হয়েছে। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আটলান্টিক কাউন্সিল আয়োজিত একটি বিশেষ সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি বৈশ্বিক গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। ড. আল জাবের বলেন, অত্যন্ত আনন্দের বিষয় যে ইতোমধ্যে আমাদের প্রস্তাবিত পাইপলাইন প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। আমরা ২০২৭ সালের যে প্রাতিষ্ঠানিক সময়সীমা নির্ধারণ করেছিলাম, তার অনেক আগেই যেন এই বিকল্প রুটটি বাণিজ্যিকভাবে চালু করা যায়, সেই লক্ষ্য নিয়ে আমাদের প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা তীব্র গতিতে কাজ করে যাচ্ছেন।হরমুজ প্রণালীর মতো একটি ঝুঁকিপূর্ণ রুট, যেখানে প্রায়শই বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বা আটকের ঘটনা ঘটে, তার ওপর নির্ভরতা কমানো সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্প্রতি আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স ও এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের কাছ থেকে সরাসরি বিশেষ নির্দেশনা পাওয়ার পর এই প্রকল্পের কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী কমিটির সর্বশেষ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও এই পাইপলাইনের কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য সর্বোচ্চ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব জোগান ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরে আল জাবের আরও বলেন, এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে সমগ্র পৃথিবীর মোট জ্বালানি সরবরাহের একটি বিশাল অংশ এখনও মাত্র অল্প কয়েকটি অত্যন্ত সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ বা চোকপয়েন্টের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। সামান্য কোনো সামরিক অস্থিরতা তৈরি হলেই পুরো বিশ্ব অর্থনীতি থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়। ঠিক এই কারণেই প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত দূরদর্শী চিন্তা থেকে হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে বিকল্প অবকাঠামো গড়ে তোলার এক সাহসী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, যার সুফল এখন মিলতে যাচ্ছে।বাস্তবায়নাধীন এই নতুন পাইপলাইনটি সরাসরি ওমান উপসাগরীয় উপকূলের কৌশলগত ফুজাইরাহ সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। আগামী ২০২৭ সালে এই প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হলে ফুজাইরাহ বন্দরের মাধ্যমে আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির তেল রপ্তানির সামগ্রিক সক্ষমতা বর্তমানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। বর্তমানে ‘হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইন’ নামে পরিচিত যে আবুধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইনটি সচল রয়েছে, তার মাধ্যমে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৮ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী না ছুঁয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। তবে নতুন এই বর্ধিত প্রকল্পটি চালু হওয়ার পর আমিরাতের জ্বালানি নিরাপত্তা এক নিভেদ্য দুর্গে পরিণত হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল ও যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতিতে এই ধরনের বিকল্প জলপথ ও ভূগর্ভস্থ তেলের মহাসড়কের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব যে আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এর ফলে যেকোনো ধরনের বৈশ্বিক সংকটেও আমিরাতের অর্থনীতি থাকবে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সচল।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল