প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
‘এই গরমে মরেই যাবো’—আদালতে সালমান এফ রহমানের আকুতি
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের পৃথক দুটি স্পর্শকাতর মামলায় বিশেষ হাজিরা দিতে সরকারের সাবেক প্রভাবশালী উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খানকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকার বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানসহ এই তিন হেভিওয়েট বন্দিকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বিশেষ প্রিজন ভ্যানে করে মহানগর দায়রা জজ আদালতে নিয়ে আসা হয়। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের আদালত প্রাঙ্গণে নিয়ে আসাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই পুরো আদালত পাড়ায় ব্যাপক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।কারাগারের বিশেষ প্রিজন ভ্যানটি যখন আদালত চত্বরে এসে পৌঁছায়, তখন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা চরম সতর্কতার সাথে বন্দিদের নামানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন। গাড়ি থেকে সবার প্রথমে নামানো হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অতি ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে। এ সময় নিরাপত্তার স্বার্থে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তাকে জোরপূর্বক বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, ভারী হেলমেট এবং হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেন। মে মাসের তীব্র তাপদাহ ও ভ্যাপসা গরমের মধ্যে এই ভারী নিরাপত্তামূলক পোশাক পরানোর সাথে সাথেই সালমান এফ রহমান চরম ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্য করে উচ্চস্বরে বলতে থাকেন যে, এই প্রচণ্ড গরমে এসব ভারী জ্যাকেট আর হেলমেট পরে তিনি মরেই যাবেন। গাড়ি থেকে নামার সময় তার চোখে-মুখে তীব্র অস্বস্তি ও ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তার ঠিক পরপরই প্রিজন ভ্যান থেকে নামানো হয় বিগত সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং ঢাকা তেরো আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খানকে। তাদের দুজনকে অবশ্য বেশ শান্ত ও নির্বিকার দেখাচ্ছিল।এই তিন বন্দিকে আদালতের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিট পরেই সেখানে আরেকটি বিশেষ প্রিজন ভ্যান এসে থামে। সেই ভ্যান থেকে নামানো হয় বিগত সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এক মালবাহী ট্রাক চালককে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় তাকে আজ আদালতে হাজির করা হয়। প্রিজন ভ্যান থেকে নামার সময় পলককে অত্যন্ত দুর্বল ও অসুস্থ দেখাচ্ছিল। তিনি নিজের দুই পায়ে ভর দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছিলেন না, যার কারণে তাকে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের কাঁধে ভর দিয়ে গাড়ি থেকে নামতে দেখা যায়। তবে অন্য বন্দিদের মতো তার মাথায় কোনো হেলমেট ছিল না। গাড়ি থেকে নামার সময় সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে জুনাইদ আহমেদ পলক বেশ আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন এবং হাত জোড় করে দেশবাসীর কাছে নিজের সুস্থতার জন্য দোয়া চান। তিনি ফিসফিস করে সাংবাদিকদের বলেন যে, তিনি সরাসরি হাসপাতাল থেকে এখানে আসছেন এবং তার শরীরে এখনও তীব্র ব্যথা রয়েছে। তবে ঠিক কোন হাসপাতাল থেকে তাকে চিকিৎসা দিয়ে আনা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট করে কিছুই বলেননি।আদালতের প্রশাসনিক ও সাধারণ আইনজীবীদের সূত্র থেকে জানা গেছে, সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক এবং সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খানকে মূলত আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দায়ের হওয়া পৃথক দুটি মামলায় আইনি শুনানির জন্য হাজির করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দেশের ব্যাংক খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করার প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। অন্যদিকে, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে জুলাই মাসের গণআন্দোলনে নিরীহ নাগরিকদের ওপর দমনের উদ্দেশ্যে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মোহাম্মদপুরে নিহত সেই ট্রাক চালকের পরিবারের দায়ের করা হত্যা মামলায় তাকে রিমান্ড শেষে আদালতে সোপর্দ করা হলো। সব বন্দিকে গাড়ি থেকে নামানোর পর আদালতের নিচতলার প্রধান হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে আইনি প্রক্রিয়া ও নথিপত্র যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট বিচারকের এজলাসে তোলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এই শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের আদালত প্রাঙ্গণে হাজির করার খবর ছড়িয়ে পড়লে সেখানে উৎসুক জনতা ও আইনজীবীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল