প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দায়ে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা স্বীকার সড়কমন্ত্রীর
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রতিনিয়ত ঝরে যাওয়া মূল্যবান প্রাণ এবং মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার জন্য এবার সরাসরি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে নিলেন সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক। সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, সড়কে প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রাষ্ট্রের এক ধরনের ব্যর্থতা জড়িয়ে রয়েছে এবং সরকার এই দায় কোনোভাবেই অস্বীকার করছে না। শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে সড়ক দুর্ঘটনায় চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও নিহতদের পরিবারের মাঝে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ এবং সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আয়োজিত এক বিশেষ গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই নজিরবিহীন ও সংবেদনশীল মন্তব্য করেন।নিজেদের অতি আদরের ও একমাত্র উপার্জনকক্ষ স্বজনদের হারিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে আসা শোকার্ত মানুষদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে মন্ত্রী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, যে সব ভাই-বোন আজ এখানে তাদের পরম প্রিয় স্বজনদের হারিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে দাঁড়িয়ে আছেন, তাদের এই অপূরণীয় মানসিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। সড়কে এই অকাল মৃত্যুর জন্য রাষ্ট্রের যে প্রশাসনিক ও কাঠামোগত ব্যর্থতা রয়েছে, তা আমরা অত্যন্ত সততার সাথে মেনে নিচ্ছি। তবে নিহতদের পরিবারগুলো যাতে সমাজে অসহায় হয়ে না পড়ে, সেজন্য রাষ্ট্র সবসময় অত্যন্ত সজাগ ও সতর্ক থাকবে। ভুক্তভোগী এই পরিবারগুলোর সন্তানদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অন্যান্য সরকারি সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, বর্তমান সরকার তা পুরোপুরি নিশ্চিত করবে।অনুষ্ঠান শেষে আসন্ন কোরবানির ঈদের সার্বিক ঈদযাত্রা ও প্রস্তুতির বিষয়ে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হন মন্ত্রী। তিন দিনের সংক্ষিপ্ত সময়ে প্রায় দেড় কোটি মানুষের ঘরে ফেরা এবং একই সাথে প্রায় এক কোটি কোরবানিযোগ্য পশুকে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নির্বিঘ্নে, আরামদায়ক ও স্বস্তিদায়কভাবে পরিবহন করা একটি বিশাল ও কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে সরকার এই চ্যালেঞ্জগুলোকে সাহসের সাথে মোকাবিলা ও সমাধানের আপ্রাণ চেষ্টা করছে। দেশের সাধারণ জনগণ যদি ট্রাফিক আইন মেনে সচেতন হন, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা যদি সহযোগিতা করেন এবং কোনো ধরনের বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ যদি হানা না দেয়, তবে এবার একটি স্বস্তিদায়ক ও নিশ্চিন্ত ঈদযাত্রা উপহার দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। বর্তমানে এই চার লেনের মহাসড়কে যে পরিমাণ যানবাহনের তীব্র চাপ রয়েছে, তা বিবেচনা করলে এটি অনতিবিলম্বে দশ লেনে উন্নীত হওয়া অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়। সেই সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়েই এখন সরকারের কাজ এগিয়ে চলছে, যার মধ্যে থাকবে আট লেনের মূল সড়ক এবং দুই লেনের বিশেষ সার্ভিস লেন। কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার কথা স্মরণ করে তিনি জানান, পুরো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে আট লেনে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিরাপদ করতে পদুয়ার বাজার এলাকায় বিশেষ আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণ করা হবে।কুমিল্লা জেলা প্রশাসন এবং বিআরটিএ কুমিল্লা সার্কেলের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মানবিক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মনিরুল হক চৌধুরী, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু, কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন, কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান এবং পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানসহ সরকারের উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ও পরিবহন খাতের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে কুমিল্লায় বিভিন্ন সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে প্রাণ হারানো ৮৬ জন নিহতের পরিবারের হাতে মোট ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং গুরুতর আহত ৩৩ জন ব্যক্তির মাঝে চিকিৎসা সহায়তার জন্য ৫৯ লাখ টাকার আর্থিক অনুদানের চেক আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল