প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬
কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হলো পরমাণু সম্মেলন
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
পরমাণু অস্ত্রের ভয়াবহতা থেকে বিশ্বকে রক্ষা করা এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত জাতিসংঘের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন কোনো ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। দীর্ঘ চার সপ্তাহ ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে নিবিড় ও জটিল দর-কষাকষি চললেও, শেষ পর্যন্ত সদস্য দেশগুলো পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধে একটি সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা আগামী দিনে বিশ্বজুড়ে পরমাণু অস্ত্রের প্রতিযোগিতা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।আমেরিকার নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদরদপ্তরে এই দীর্ঘমেয়াদি সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সম্মেলনের প্রেসিডেন্ট তথা ভিয়েতনামের বিশিষ্ট কূটনীতিক দো হুং ভিয়েত অত্যন্ত হতাশা ব্যক্ত করে এই ব্যর্থতার খবর নিশ্চিত করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর পারস্পরিক মতবিরোধ দূর করতে এবং একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছাতে তাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু সমস্ত চেষ্টা সত্ত্বেও সম্মেলনটি এমন একটি অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি যেখানে মূল বিষয়গুলো নিয়ে সবাই একমত হতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য কোনো খসড়া নথি বা প্রস্তাবনা আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন না করার সিদ্ধান্ত নেন, যা মূলত এই দীর্ঘ আলোচনার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ও ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ।বার্তা সংস্থা এএফপির হাতে আসা সম্মেলনের একটি খসড়া নথির সূত্র থেকে জানা গেছে, এবারের আলোচনায় অন্যতম প্রধান একটি বিষয় ছিল তেহরান বা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। ওই খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছিল যে, যেসব দেশের কাছে বর্তমানে কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র নেই, তারা ভবিষ্যতে কখনোই এই ধরনের গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি বা নিজেদের হেফাজতে রাখতে পারবে না। মূলত বিশ্বমঞ্চে পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার সম্পূর্ণ বন্ধ করার অংশ হিসেবেই এই কড়া শর্তের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। তবে বিভিন্ন দেশের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সমীকরণের কারণে এই প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।আসলে নিউইয়র্কের এই সম্মেলনে বিশ্বনেতা ও কূটনীতিকেরা একত্রিত হয়েছিলেন কয়েক দশকের পুরোনো এবং ঐতিহাসিক ‘পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি’ বা এনপিটি-র কার্যকারিতা পর্যালোচনা করার জন্য। এই আন্তর্জাতিক চুক্তির মূল ভিত্তি ছিল, বিশ্বের ১৯১টি দেশ এই শর্তে একমত হয়েছিল যে, পরমাণু অস্ত্র কেবল ১৯৬৭ সালের ১ জানুয়ারির আগে এই প্রযুক্তি অর্জনকারী পাঁচটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত দেশগুলো হলো—চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই চুক্তির বাইরে গিয়ে পরবর্তী সময়ে আরও চারটি দেশ নিজেদের পরমাণু শক্তির অধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, ইসরাইল এবং উত্তর কোরিয়া। এই বৈষম্য এবং নতুন পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোর অবস্থান চুক্তির কার্যকারিতাকে বরাবরই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।বিশ্বে পরমাণু অস্ত্রের বর্তমান ভয়াবহ চিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছে বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা সিপরি। তাদের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত হিসাব করলে দেখা যায় যে, পুরো বিশ্বে এই মুহূর্তে সচল ও মজুত থাকা মোট ১২ হাজার ২৪১টি পরমাণু ওয়ারহেড বা বোমার প্রায় ৯০ শতাংশেরই একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কেবল দুটি পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার হাতে। এই বিশাল পরিমাণ মারণাস্ত্র পুরো মানবজাতিকে যেকোনো মুহূর্তে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর এমন একটি সংকটময় পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন ব্যর্থ হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, বিশ্বশান্তি ও নিরস্ত্রীকরণের চেয়ে পরাশক্তিগুলোর কাছে নিজেদের সামরিক আধিপত্য বজায় রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে, এই ব্যর্থতা বিশ্বজুড়ে পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকিকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিল বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল