জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সারা দেশে বইছে নির্বাচনের আমেজ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচন এই উত্তাপকে আরও উজ্জ্বল করেছে। ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চকসুর মতো বড় বড় ক্যাম্পাসে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হলেও দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) এখনও কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ বছরেও একবারও ছাত্রসংসদ অনুষ্ঠিত হয়নি।
গত মে মাসে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিদায়ী ভিসি শুচিতা শরমিন সরে দাঁড়ান। এরপর নতুন ভিসি হিসেবে যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০ দিন পর শিক্ষার্থীরা তার কাছে ৮২ দফা দাবি পেশ করেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল দ্রুত ছাত্রসংসদ আয়োজন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আশ্বাসের বাইরে প্রশাসনের তেমন কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি।
বর্তমানে উন্নয়ন, আয়তন সম্প্রসারণ ও পরিবহন সংকট নিরসন নিয়ে আন্দোলন চললেও সেখানেও ছাত্রসংসদের প্রসঙ্গ স্থান পায়নি। ফলে এ বিষয়ে কার্যত নীরব রয়েছে ববি।
গণভোটের ফলাফল: ৮২% শিক্ষার্থীর পক্ষে
২২ থেকে ২৭ জুলাই ববি গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল একটি গণভোটের আয়োজন করে। এতে ৮২.২ শতাংশ শিক্ষার্থী ছাত্রসংসদের পক্ষে মত দেন, আর বিপক্ষে ভোট দেন মাত্র ১১ শতাংশ। এর ভিত্তিতে সংগঠনটি ৩ আগস্ট ভিসির কাছে স্মারকলিপি জমা দিলেও প্রশাসনের সাড়া মেলেনি বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন।
শিক্ষার্থী ও সংগঠনের মতামত
গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের নেত্রী ভূমিকা সরকার বলেন, শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট চাওয়া হলো ছাত্রসংসদ। তবে লিখিত দাবি দেওয়ার পরও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ পাওয়া যায়নি।
ববি সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম মনে করেন, ছাত্রসংসদ শিক্ষার্থীদের অধিকার, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে অপরিহার্য। তার মতে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই প্রকৃত সমস্যার সমাধান করতে পারেন।
ছাত্রদল নেতা মোশাররফ হোসেন বলেন, ছাত্রসংসদ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তার আগে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিচার নিশ্চিত করে ফ্যাসিস্টমুক্ত ক্যাম্পাস গড়া জরুরি। একইভাবে শিবিরের সভাপতি আমিনুল ইসলাম মনে করেন, প্রশাসনের দুর্বলতা এবং জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণে ব্যর্থতার কারণে রোডম্যাপ ঘোষণা বিলম্বিত হচ্ছে।
প্রশাসনের বক্তব্য
ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা পরিচালক সুজন চন্দ্র পাল জানান, তিনি ভিসিকে বিষয়টি অবহিত করেছেন এবং আশা করছেন শিগগিরই প্রশাসন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংসদ চালু করবে।
প্রক্টর ড. রাহাত হোসাইন ফয়সাল বলেন, প্রশাসন এ বিষয়ে ইতিবাচক। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ছাত্রসংসদের উল্লেখ না থাকায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মুহসিন উদ্দিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে ছাত্র-শিক্ষকের রাজনৈতিক সংগঠন না থাকার একটি সিদ্ধান্ত পাস হয়েছিল, তবে কার্যত এর প্রয়োগ হয়নি। প্রতিনিধি নির্বাচনের ধারার আওতায় নতুন নিয়ম করা যেতে পারে, যদিও কাজটি সহজ নয়।
উপাচার্যের প্রতিশ্রুতি
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, তিনি ছাত্রসংসদ বিষয়ে ইতিবাচক। তার মতে, নির্বাচিত বডি এলে প্রশাসনের চাপ কমবে এবং নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ তৈরি হবে। তবে আইনে বিষয়টি উল্লেখ না থাকায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্রিয়া শেষ হলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ও দ্রুত সেই পথ অনুসরণ করে কার্যক্রম শুরু করবে।