জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে জাতীয় সংসদে সৃষ্টি হয়েছে ঐক্যের নতুন নজির। একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলক লোডশেডিং করে সেই বিদ্যুৎ গ্রামীণ কৃষিখাতে সরবরাহের সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শ্বেতপত্র প্রকাশের অঙ্গীকার অধিবেশনটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।গতকাল বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২০তম দিনে এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও আলোচনা উঠে আসে। স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকার ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ সংসদীয় কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করে।অধিবেশনের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতিকে “জাতীয় সংকট” হিসেবে অভিহিত করেন। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।প্রস্তাবটি স্বাগত জানিয়ে বিরোধী দলও সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। জানানো হয়, কমিটি দ্রুত বাস্তবসম্মত সুপারিশ প্রণয়ন করবে এবং তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে।বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় বৈষম্য কমাতে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হবে।এই বিদ্যুৎ বোরো মৌসুমে কৃষকদের সেচকাজে ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়। সরকারের মতে, শহর-গ্রামের বৈষম্য হ্রাস করে উৎপাদনশীল খাতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের এটি একটি বাস্তবমুখী উদ্যোগ।প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ রয়েছে প্রায় ২৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত আমদানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে উন্নয়ন কার্যক্রম দৃশ্যমান হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।শিক্ষামন্ত্রী সংসদে জানান, গত ১৬ বছরের শিক্ষা খাতের দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে।এছাড়া জাল সনদের অভিযোগে ইতোমধ্যে ২০২ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণে নিয়োগ প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে বলেও জানান তিনি।মাদ্রাসা শিক্ষায় কারিগরি কোর্স চালুর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। এর মধ্যে ছিল—
স্থানীয় গ্যাস ব্যবহারে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা
উত্তরবঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপন
শিল্প প্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন
এসব দাবির প্রতি সরকার ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে।অধিবেশনের শেষ দিকে স্পিকার সংসদ সদস্যদের আচরণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সংসদের ভেতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মোবাইল ফোন ব্যবহার সীমিত করা এবং কার্যপ্রণালী বিধি মেনে চলার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।দিনভর আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, দেশের বড় সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা সংস্কার এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন কৌশলের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ফলে এই অধিবেশনকে অনেকেই রাজনৈতিক সহাবস্থান, স্বচ্ছতা এবং বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণের এক নতুন সূচনা হিসেবে দেখছেন।