ইরানের হরমুজ প্রণালি অচল করে দেওয়ার সাম্প্রতিক কৌশল বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির চিরাচরিত সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। সামরিক শক্তির চেয়ে ‘অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এই ‘ইরানি মডেল’ এখন বেইজিংয়ের সামরিক পরিকল্পনাবিদদের জন্য এক নতুন পথরেখা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ণ শক্তির নৌযুদ্ধ ছাড়াই তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন করার এই ছক বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর বাজার তথা সামগ্রিক অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে।সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক ড. লি কা-শুয়েন তার সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ইরান প্রমাণ করেছে যে একটি সমুদ্রপথ বন্ধ করতে সব জাহাজ ডোবানোর প্রয়োজন নেই। কেবল সুনির্দিষ্ট কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে বেসরকারি বিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ‘চরম ঝুঁকি’ বা ‘অনিশ্চয়তা’ তৈরি করলেই বাণিজ্যিকভাবে ওই পথ অচল হয়ে পড়ে।চীনের সামরিক পরিকল্পনাবিদেরা এখন এই সফল মডেলটি তাইওয়ানের ওপর প্রয়োগের কথা ভাবছেন। যদি চীন তাইওয়ান প্রণালিতে নিজস্ব আইনি নিয়ন্ত্রণ ঘোষণা করে এবং কিছু এলাকাকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত করে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়, তবে আন্তর্জাতিক বিমা বাজার তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে।নৌ-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রচলিত ‘ফাইভ পাওয়ার ক্লজ’ অনুযায়ী—যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া বা চীনের মধ্যে কোনো প্রত্যক্ষ সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বিমা সুবিধা হারায়। ফলে বেইজিংয়ের সামান্য সামরিক উস্কানিই তাইওয়ানের চারপাশে জাহাজ চলাচল বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট। এর ফলে কোনো আনুষ্ঠানিক অবরোধ ছাড়াই তাইওয়ানের বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়বে।ড. লি-এর মতে, তাইওয়ান সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাব হরমুজ প্রণালির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভয়াবহ হবে। এর প্রধান কারণ হলো সেমিকন্ডাক্টর বা কম্পিউটার চিপ। তেলের বিকল্প শক্তি বা দীর্ঘমেয়াদি মজুত সম্ভব হলেও, চিপসের প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় এটি তেলের মতো বছরের পর বছর মজুত রাখা যায় না। বিশ্বের ৯০ শতাংশ উন্নত চিপ তৈরি হয় তাইওয়ানে। এই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে অটোমোবাইল, টেলিযোগাযোগ এবং বৈশ্বিক অর্থবাজার পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়বে।পশ্চিমের দেশগুলো যখন কেবল নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ভাবছে, চীন তখন বছরের পর বছর ধরে গড়ে তুলেছে ‘ফেলানিক্স ইকোনমি’ (Phalanx Economy) বা কেল্লা অর্থনীতি। ২০২২ সাল নাগাদ চীন বিশ্বের: ৬৯% ভুট্টা, ৬০% চাল, ৫১% গম নিজেদের গুদামে মজুত করেছে।একই সাথে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নির্দেশে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিগুলো রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি মজুত করছে। তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট—যেকোনো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় গণতান্ত্রিক মিত্রদেশগুলোর চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকা।প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, মিত্র দেশগুলোর মধ্যে এখনো সমন্বিত কোনো প্রস্তুতি নেই। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সরকারি বিমা কর্মসূচি চালুর চেষ্টা হলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। উল্টো সংকটের সময় মিত্রদেশগুলো এখন জ্বালানি সংগ্রহের জন্য একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে।তাইওয়ান নিয়ে ওয়াশিংটন হয়তো সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না, কিন্তু চীনের এই কৌশলগত অর্থনৈতিক অবরোধ বিশ্বকে এক দীর্ঘমেয়াদি মন্দার মুখে ফেলবে। বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সামরিক শক্তি নয়, বরং অত্যাবশ্যকীয় চিপ ও যন্ত্রপাতির নিজস্ব মজুত তৈরি এবং শক্তিশালী লজিস্টিক চুক্তি করাই এখন পশ্চিমা মিত্রদের টিকে থাকার একমাত্র পথ। সংকট দরজায় কড়া নাড়ার আগেই প্রস্তুতির সময় এখনই।