ঢাকার কেরানীগঞ্জে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে। দিনে চুলা জ্বলে না, কেউ কেউ ভোররাতে উঠে রান্না করেন। অনেক পরিবার এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ও ইলেকট্রিক চুলার ওপর নির্ভর করছেন। এতে সাধারণ গ্রাহকদের মাসিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অথচ এলাকাজুড়ে চলছে অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিশাল কারবার, যা থেকে প্রতি মাসে আদায় হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এলাকাবাসী এর দায় দিচ্ছেন তিতাস গ্যাস কোম্পানির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ শাহ আলম এবং আবুল হোসেন খোকনের নেতৃত্বে গত ১৫ বছরে কেরানীগঞ্জে ৫০-৬০ হাজার অবৈধ চুলা সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব সংযোগ থেকে প্রতিমাসে তিন-চার কোটি টাকা আদায় হয়। এছাড়া স্থানীয় কলকারখানা, ওয়াশিং, ডাইং ও শিট কাটিং ফ্যাক্টরি থেকেও মাসে কয়েক কোটি টাকা তোলা হয়।
তিতাসের সাবেক এক কর্মকর্তার দাবি, এই অবৈধ আয় থেকে অংশ পান রাজনৈতিক নেতা, তিতাসের শীর্ষ কর্মকর্তারা, এমনকি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও কিছু সাংবাদিকও। কেরানীগঞ্জের ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টিতে গ্যাস সংযোগ রয়েছে। বৈধ সংযোগ আছে প্রায় ৩০ হাজার, তবে এর মধ্যে পাঁচ হাজার ইতোমধ্যে বিল বাকি থাকায় বিচ্ছিন্ন করেছে তিতাস।
হাসনাবাদ এলাকার গৃহবধূ সাবেরা বেগম বলেন, রাত দেড়টার পর গ্যাস আসে, তাই রান্নার জন্য তাকে মাটির চুলা বা সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে হয়। এলাকাজুড়ে দেখা যায় বৈধ সংযোগের পাশাপাশি অবৈধ সংযোগ ব্যবহার। হাসনাবাদে ৫০০ ভবনের মধ্যে মাত্র ২০০ বৈধ সংযোগ রয়েছে। এর বাইরেও কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠানে অবৈধ লাইন সচল রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আগানগর, জিনজিরা, কালীগঞ্জ, কালিন্দীসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে উঠেছে অবৈধ সংযোগের নেটওয়ার্ক। শুধু মডেল টাউনে ৫ হাজার অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে ভুয়া দলিল ব্যবহার করে। এখান থেকেও প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকা ভাগাভাগি হয়।
তিতাসের সাবেক কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অবৈধ সংযোগের টাকার ভাগ যায় তিতাস গ্যাসের পিয়ন থেকে শুরু করে এমডি পর্যন্ত। এজন্য গড়ে উঠেছে ঠিকাদার মালিক সমিতি ও কল্যাণ সমিতির নামে শক্তিশালী চক্র।
তিতাস গ্যাসের জিনজিরা অফিসের ম্যানেজার দেওয়ান নাজির স্বীকার করেন, এলাকায় হাজার হাজার অবৈধ সংযোগ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, জনবল কম থাকায় আপাতত কেবল কারখানার অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে, বাসাবাড়ির অবৈধ চুলা পরে বিচ্ছিন্ন করা হবে।
অন্যদিকে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, তিতাস অফিসের কর্মকর্তাদের মদদ ছাড়া এত বড় অবৈধ নেটওয়ার্ক চালানো সম্ভব নয়। একাধিক কারখানা মালিক জানান, গ্যাস সংকটে অনেক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, আর যেগুলো চালু আছে সেগুলো ‘ম্যানেজ’ করেই টিকে আছে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ শাহ আলম এক পর্যায়ে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করলেও বর্তমানে বিএনপির নেতারাও এতে যুক্ত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে বিএনপির এক নেতা জানান, এখনো শাহ আলমের প্রভাবই বেশি।
তিতাস গ্যাসের উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. মাহবুব হোসেন বলেন, কেরানীগঞ্জে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে প্রতি মাসে শতাধিক অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। তবে ঘুষ ও ভাগাভাগির অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।