দিকপাল

চীন সফরে ট্রাম্পের প্রত্যাশা, বাস্তবে সীমিত সাফল্য


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬ | ১০:৪০ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

চীন সফরে ট্রাম্পের প্রত্যাশা, বাস্তবে সীমিত সাফল্য

আমেরিকা ও চীনের শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার বহুল আলোচিত বেইজিং সফরটি সমাপনী পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি জিনপিং যখন আলোচনার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন বিশ্ববাসীর নজর এখন এই বৈঠকের প্রকৃত অর্জনের দিকে। যদিও সফরের শুরু থেকেই দুই দেশের নেতাদের মধ্যে বাহ্যিক সৌহার্দ্য এবং রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতা লক্ষ্য করা গেছে, তবে পর্দার আড়ালে বড় কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক চুক্তির অভাব বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই বৈঠককে অত্যন্ত ফলপ্রসূ এবং বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম শীর্ষ সম্মেলন হিসেবে দাবি করা হলেও, খাতা-কলমে বড় কোনো অগ্রগতির খবর এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

সফরের প্রথম দিনে জাঁকজমকপূর্ণ আবহে দুই দেশের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদের বাণী শোনানো হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীন ও আমেরিকার সম্পর্ককে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব হিসেবে অভিহিত করেন। গ্রেট হল অব দ্য পিপলে দীর্ঘ সময় ধরে চলা বৈঠকে পারস্পরিক সহযোগিতার নানা দিক উঠে এলেও, সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবসায়িক কাঠামোর ঘোষণা আসেনি। অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাণিজ্যিক আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও তাইওয়ান ইস্যুতে নিজের কঠোর অবস্থান থেকে একচুলও নড়েননি। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তাইওয়ান প্রশ্নে কোনো ভুল পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা দুই দেশকেই সরাসরি যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

এই সফরের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল আমেরিকার প্রতিনিধি দলে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতাদের উপস্থিতি। বেইজিংয়ে পা রাখা প্রতিনিধি দলে ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়া প্রধান জেনসেন হুয়াংয়ের মতো ব্যক্তিদের উপস্থিতি বিশ্ব বাণিজ্যের এক বিশেষ বার্তা বহন করে। বৈদ্যুতিক যান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপের মতো সংবেদনশীল প্রযুক্তি খাতে চীনের সাথে আমেরিকার যে জটিল সম্পর্ক রয়েছে, এই নেতাদের উপস্থিতি সেই গুরুত্বকেই তুলে ধরেছে। বিশেষ করে জেনসেন হুয়াংয়ের আচমকা উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অত্যাধুনিক চিপ প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশাধিকার নিয়ে হয়তো পর্দার আড়ালে গভীর কোনো আলোচনা চলছে। ট্রাম্প পরে একটি সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, চীন এসব খাতে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে, যদিও এর বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

তবে বড় প্রত্যাশার মাঝে কিছুটা হতাশাও তৈরি হয়েছে বোয়িং নিয়ে। ট্রাম্প চীন কর্তৃক ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে ঐকমত্যের কথা জানালেও বিশ্লেষকদের চোখে এই সংখ্যাটি ছিল প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। দীর্ঘ এক দশক পর এমন একটি ক্রয়ের ঘোষণা আসলেও বাজারের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় বোয়িংয়ের শেয়ারের দামে বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। সামগ্রিকভাবে দেখলে, এই সফরটি কোনো বড় চুক্তির পরিবর্তে মূলত একটি নাজুক বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার প্রচেষ্টায় পরিণত হয়েছে। উভয় পক্ষই শুল্ক বৃদ্ধি স্থগিত রাখা এবং খনিজ সম্পদের সরবরাহ বজায় রাখার মতো পুরোনো সমঝোতাগুলোকেই নতুন করে ঝালিয়ে নিয়েছে।

কৃষি ও জ্বালানি খাতে চীনের বাজার উন্মুক্ত করার বিষয়ে বেইজিং কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও তা কোনো নির্দিষ্ট চুক্তির রূপ নেয়নি। আমেরিকার সয়াবিন, মাংস এবং পোলট্রি পণ্যের জন্য চীনের দরজা কতটা খুলবে, তা এখনো আলোচনার টেবিলেই রয়ে গেছে। তবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেনার ক্ষেত্রে চীনের আগ্রহের বিষয়টি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। আলোচনার সবশেষে উঠে এসেছে ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্য প্রসঙ্গ। বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব খাটানোর জন্য ট্রাম্প আহ্বান জানিয়েছেন। সফরের ইতি টানার আগে ট্রাম্প আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর শি জিনপিংকে হোয়াইট হাউসে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, বেইজিংয়ে যা অপূর্ণ রয়ে গেল, ওয়াশিংটনের সেই বৈঠকে তা পূর্ণতা পায় কি না।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬


চীন সফরে ট্রাম্পের প্রত্যাশা, বাস্তবে সীমিত সাফল্য

প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬

featured Image

আমেরিকা ও চীনের শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার বহুল আলোচিত বেইজিং সফরটি সমাপনী পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি জিনপিং যখন আলোচনার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন বিশ্ববাসীর নজর এখন এই বৈঠকের প্রকৃত অর্জনের দিকে। যদিও সফরের শুরু থেকেই দুই দেশের নেতাদের মধ্যে বাহ্যিক সৌহার্দ্য এবং রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতা লক্ষ্য করা গেছে, তবে পর্দার আড়ালে বড় কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক চুক্তির অভাব বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই বৈঠককে অত্যন্ত ফলপ্রসূ এবং বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম শীর্ষ সম্মেলন হিসেবে দাবি করা হলেও, খাতা-কলমে বড় কোনো অগ্রগতির খবর এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

সফরের প্রথম দিনে জাঁকজমকপূর্ণ আবহে দুই দেশের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদের বাণী শোনানো হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীন ও আমেরিকার সম্পর্ককে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব হিসেবে অভিহিত করেন। গ্রেট হল অব দ্য পিপলে দীর্ঘ সময় ধরে চলা বৈঠকে পারস্পরিক সহযোগিতার নানা দিক উঠে এলেও, সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবসায়িক কাঠামোর ঘোষণা আসেনি। অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাণিজ্যিক আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও তাইওয়ান ইস্যুতে নিজের কঠোর অবস্থান থেকে একচুলও নড়েননি। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তাইওয়ান প্রশ্নে কোনো ভুল পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা দুই দেশকেই সরাসরি যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

এই সফরের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল আমেরিকার প্রতিনিধি দলে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতাদের উপস্থিতি। বেইজিংয়ে পা রাখা প্রতিনিধি দলে ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়া প্রধান জেনসেন হুয়াংয়ের মতো ব্যক্তিদের উপস্থিতি বিশ্ব বাণিজ্যের এক বিশেষ বার্তা বহন করে। বৈদ্যুতিক যান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপের মতো সংবেদনশীল প্রযুক্তি খাতে চীনের সাথে আমেরিকার যে জটিল সম্পর্ক রয়েছে, এই নেতাদের উপস্থিতি সেই গুরুত্বকেই তুলে ধরেছে। বিশেষ করে জেনসেন হুয়াংয়ের আচমকা উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অত্যাধুনিক চিপ প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশাধিকার নিয়ে হয়তো পর্দার আড়ালে গভীর কোনো আলোচনা চলছে। ট্রাম্প পরে একটি সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, চীন এসব খাতে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে, যদিও এর বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

তবে বড় প্রত্যাশার মাঝে কিছুটা হতাশাও তৈরি হয়েছে বোয়িং নিয়ে। ট্রাম্প চীন কর্তৃক ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে ঐকমত্যের কথা জানালেও বিশ্লেষকদের চোখে এই সংখ্যাটি ছিল প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। দীর্ঘ এক দশক পর এমন একটি ক্রয়ের ঘোষণা আসলেও বাজারের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় বোয়িংয়ের শেয়ারের দামে বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। সামগ্রিকভাবে দেখলে, এই সফরটি কোনো বড় চুক্তির পরিবর্তে মূলত একটি নাজুক বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার প্রচেষ্টায় পরিণত হয়েছে। উভয় পক্ষই শুল্ক বৃদ্ধি স্থগিত রাখা এবং খনিজ সম্পদের সরবরাহ বজায় রাখার মতো পুরোনো সমঝোতাগুলোকেই নতুন করে ঝালিয়ে নিয়েছে।

কৃষি ও জ্বালানি খাতে চীনের বাজার উন্মুক্ত করার বিষয়ে বেইজিং কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও তা কোনো নির্দিষ্ট চুক্তির রূপ নেয়নি। আমেরিকার সয়াবিন, মাংস এবং পোলট্রি পণ্যের জন্য চীনের দরজা কতটা খুলবে, তা এখনো আলোচনার টেবিলেই রয়ে গেছে। তবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেনার ক্ষেত্রে চীনের আগ্রহের বিষয়টি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। আলোচনার সবশেষে উঠে এসেছে ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্য প্রসঙ্গ। বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব খাটানোর জন্য ট্রাম্প আহ্বান জানিয়েছেন। সফরের ইতি টানার আগে ট্রাম্প আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর শি জিনপিংকে হোয়াইট হাউসে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, বেইজিংয়ে যা অপূর্ণ রয়ে গেল, ওয়াশিংটনের সেই বৈঠকে তা পূর্ণতা পায় কি না।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল