পরোক্ষ ও উৎসে করের অতিনির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ: বিশেষজ্ঞরা
বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে পরোক্ষ কর ও উৎসে করের ওপর বিদ্যমান অতিরিক্ত নির্ভরতা অনতিবিলম্বে কমিয়ে আনতে হবে। এর পরিবর্তে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো এবং একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও সমন্বিত কর ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারে অবস্থিত বিডিবিএল ভবনে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত একটি গোলটেবিল আলোচনায় দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও কর বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। ‘পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরশীলতা: অর্থনীতির ওপর বহুমুখী প্রভাব’ শীর্ষক এই আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান কর কাঠামো দিন দিন মারাত্মকভাবে পশ্চাৎমুখী হয়ে উঠছে। এর ফলে সাধারণ ভোক্তা এবং আইন মেনে চলা বৈধ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর করের একটি অসম ও অতিরিক্ত বোঝা চেপে বসছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে ব্যাহত করছে।আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রখ্যাত কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পরোক্ষ কর ও উৎসে করের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়ে একদম সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ওপর। দেশের শিল্পভিত্তিক গবেষণা এবং তথ্যের স্বচ্ছতার অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান কর কাঠামো করপোরেট খাতের প্রকৃত মুনাফার সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না। করের হারকে সবসময় প্রতিষ্ঠানের আসল মুনাফার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা উচিত। একই সঙ্গে কর ফাঁকি রোধ এবং কর প্রশাসনে শতভাগ স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে ই-ইনভয়েসিং বা ইলেকট্রনিক রসিদ ব্যবস্থা এবং ক্যাশলেস বা নগদবিহীন লেনদেনের অর্থনীতি গড়ে তোলার জোর প্রস্তাব দেন তিনি।পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, দেশের বিদ্যমান কর ব্যবস্থা এতটাই পশ্চাৎমুখী যে এটি সমাজে দারিদ্র্য দূরীকরণ কিংবা ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। বর্তমানে দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় সাতাশ থেকে আটাশ শতাংশই আসে কাস্টমস শুল্ক থেকে। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী এই শুল্কের হার বাধ্যতামূলকভাবে কমিয়ে আনতে হবে। ফলে এখন থেকেই ভ্যাট ও কাস্টমস-নির্ভর কাঠামো থেকে বের হয়ে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর বিকল্প নেই। করদাতাদের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, কর দেওয়ার প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় এবং কর কর্মকর্তাদের হাতে হয়রানির ভয় থাকায় অনেকেই কর দিতে উৎসাহ পান না। এই ভীতি দূর করতে না পারা রাজস্ব আদায়ের একটি বড় বাধা। এর পাশাপাশি চড়া আমদানি ব্যয় এবং জিডিপির তুলনায় বাজেটের কম অনুপাত দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ক্রমান্বয়ে সীমিত করে ফেলছে।রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট-এর নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ জানান, পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরতা এবং খুব সীমিতসংখ্যক করদাতার ওপর বারবার চাপ সৃষ্টি করাই দেশের প্রধান আর্থিক সংকট হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য করের জাল ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করতে হবে। বিশেষ করে শহরের বিপুলসংখ্যক বিলাসবহুল সম্পত্তি এবং কর দেওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে করের আওতায় আনা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তিগত সমন্বয় এবং কর আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া কোনোভাবেই টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ ফরিদউদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কর সংস্কার নিয়ে বছরের পর বছর ধরে কেবল আলোচনা ও টেবিল বৈঠকই হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সামান্য। দেশে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বা ব্যয় লাগামহীনভাবে বাড়ার পেছনে তিনি জটিল শুল্কায়ন প্রক্রিয়া, একাধিক শুল্কের হার এবং অতিরিক্ত সম্পূরক শুল্ককে দায়ী করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, দেশের রাজস্ব প্রশাসনের গুণগত উন্নতির জন্য একটি সমন্বিত ও স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল কর ব্যবস্থা অপরিহার্য এবং এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, যা ছাড়া কোনো সংস্কারই টেকসই রূপ পাবে না।ইউনিলিভার বাংলাদেশের কর বিভাগের সাবেক প্রধান সাঈদ আহমেদ খান বলেন, আমাদের দেশে একাধিক ধাপে কর আরোপ করার প্রবণতা রয়েছে। তার ওপর ভুল মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে নিয়ম মেনে চলা সৎ ব্যবসায়ীরা বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। এর ফলে পণ্যের উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে এবং শেষপর্যন্ত সেই বাড়তি করের পুরো চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ঘাড়ে। একই সুরে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হোসেন অভিযোগ করেন যে, দেশের বর্তমান রাজস্ব ব্যবস্থা এখন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। রেস্তোরাঁ খাতে একাধিক ধাপে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও করের বোঝা চাপানোর কারণে এই ব্যবসা পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি একটি একক ও সমন্বিত ভ্যাট কাঠামোর দাবি জানিয়ে বলেন, সঠিক নীতিনির্ধারণের জন্য সরকারের কাছে বাস্তবসম্মত কোনো তথ্য বা উপাত্ত নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রে করনীতি ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ে চাঁদাবাজির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সবশেষে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আকতার মালা বলেন, পরোক্ষ ও উৎসে করের প্রতি অতিঝোঁক পুরো ব্যবস্থাকে বৈষম্যমূলক করে তুলেছে। দেশের করদাতার সংখ্যা সীমিত হওয়ায় এবং নিয়মনীতি পরিপালনের দুর্বলতার সুযোগে মাত্র গুটিকয়েক সৎ ব্যবসায়ীর ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত।