ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন এবং শক্তিশালী মেরুকরণ স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। উত্তর আফ্রিকার অন্যতম প্রভাবশালী দেশ আলজেরিয়ার সঙ্গে তুরস্কের ঐতিহাসিক এবং কৌশলগত সম্পর্ক বর্তমানে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। পাঁচশ বছরেরও বেশি পুরনো উসমানীয় আমলের ভ্রাতৃত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক এখন কেবল আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক এক শক্তিশালী জোটে রূপান্তরিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, আলজেরিয়ার এই ক্রমবর্ধমান তুর্কি ঘনিষ্ঠতা দেশটিকে সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মিসরের সমন্বয়ে গঠিত একটি সম্ভাব্য শক্তিশালী বলয়ে যুক্ত হওয়ার পথে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে। বিষয়টিকে সময়ের ব্যাপার হিসেবে দেখছেন অনেক ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৫১৬ সালে উসমানীয় সুলতান প্রথম সেলিমের হাত ধরে এই সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল, যখন বারবারোসা ভ্রাতৃদ্বয় আলজেরিয়ার উপকূলকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। সেই থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংহতি বজায় রয়েছে। সম্প্রতি আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুনের আঙ্কারা সফর এই গভীর সম্পর্কেরই প্রতিফলন। গত কয়েক বছরে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে বারবার সফর বিনিময় হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষা খাতের উন্নয়ন। এবারের সফরে প্রতিরক্ষা, খনিজ সম্পদ, পরিবহন এবং জ্বালানি খাতের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ১৪টি নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দুই দেশের অংশীদারত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যখন মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় ক্ষমতার ভারসাম্যে আমূল পরিবর্তন ঘটছে, তখন আলজেরিয়া ও তুরস্কের এই ঐক্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আলজেরিয়া বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি প্রাকৃতিক গ্যাস মজুতকারী দেশের একটি। জ্বালানি বাজারের এই বিশাল শক্তি দেশটিকে এক অপরাজেয় কূটনৈতিক অবস্থানে নিয়ে গেছে। তুরস্কের বার্ষিক জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আলজেরীয় এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সাল নাগাদ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং আগামী কয়েক বছরে তা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আলজেরিয়ায় বর্তমানে সহস্রাধিক তুর্কি কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে, যা দেশটিতে তুরস্ককে অন্যতম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
প্রতিরক্ষা এবং সামরিক খাতেও দুই দেশের সহযোগিতা এখন দৃশ্যমান। ড্রোন প্রযুক্তি, অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গোলাবারুদ যৌথভাবে উৎপাদন করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। এর ফলে উত্তর আফ্রিকায় তুরস্কের প্রভাব যেমন বাড়ছে, তেমনি আলজেরিয়ার সামরিক সক্ষমতাও নতুন মাত্রা পাচ্ছে। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এবং প্রেসিডেন্ট তেব্বুনের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক বিশ্বমঞ্চে বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যু এবং পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ক্ষেত্রে অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে আঙ্কারা ও আলজেরিয়া এখন একে অপরের প্রধান সহযোগী।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে বিদ্যমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের সাথে আলজেরিয়ার এই সক্রিয় অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ভূ-রাজনীতিতে ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রবিন্দু তৈরি করবে। এই জোট শক্তিশালী হলে তা এই অঞ্চলে ইসরায়েল-কেন্দ্রিক পশ্চিমা পরিকল্পনাগুলোর গতি কমিয়ে দিতে পারে। একই সাথে এটি আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং লোহিত সাগর সংলগ্ন এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। আলজেরিয়া ও তুরস্কের এই কৌশলগত মহাজোট কেবল দ্বিপক্ষীয় সমৃদ্ধিই আনবে না, বরং এটি একটি বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তথ্যের উৎস: ডেইলি সাবাহ

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন এবং শক্তিশালী মেরুকরণ স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। উত্তর আফ্রিকার অন্যতম প্রভাবশালী দেশ আলজেরিয়ার সঙ্গে তুরস্কের ঐতিহাসিক এবং কৌশলগত সম্পর্ক বর্তমানে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। পাঁচশ বছরেরও বেশি পুরনো উসমানীয় আমলের ভ্রাতৃত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক এখন কেবল আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক এক শক্তিশালী জোটে রূপান্তরিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, আলজেরিয়ার এই ক্রমবর্ধমান তুর্কি ঘনিষ্ঠতা দেশটিকে সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মিসরের সমন্বয়ে গঠিত একটি সম্ভাব্য শক্তিশালী বলয়ে যুক্ত হওয়ার পথে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে। বিষয়টিকে সময়ের ব্যাপার হিসেবে দেখছেন অনেক ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৫১৬ সালে উসমানীয় সুলতান প্রথম সেলিমের হাত ধরে এই সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল, যখন বারবারোসা ভ্রাতৃদ্বয় আলজেরিয়ার উপকূলকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। সেই থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংহতি বজায় রয়েছে। সম্প্রতি আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুনের আঙ্কারা সফর এই গভীর সম্পর্কেরই প্রতিফলন। গত কয়েক বছরে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে বারবার সফর বিনিময় হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষা খাতের উন্নয়ন। এবারের সফরে প্রতিরক্ষা, খনিজ সম্পদ, পরিবহন এবং জ্বালানি খাতের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ১৪টি নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দুই দেশের অংশীদারত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যখন মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় ক্ষমতার ভারসাম্যে আমূল পরিবর্তন ঘটছে, তখন আলজেরিয়া ও তুরস্কের এই ঐক্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আলজেরিয়া বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি প্রাকৃতিক গ্যাস মজুতকারী দেশের একটি। জ্বালানি বাজারের এই বিশাল শক্তি দেশটিকে এক অপরাজেয় কূটনৈতিক অবস্থানে নিয়ে গেছে। তুরস্কের বার্ষিক জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আলজেরীয় এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সাল নাগাদ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং আগামী কয়েক বছরে তা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আলজেরিয়ায় বর্তমানে সহস্রাধিক তুর্কি কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে, যা দেশটিতে তুরস্ককে অন্যতম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
প্রতিরক্ষা এবং সামরিক খাতেও দুই দেশের সহযোগিতা এখন দৃশ্যমান। ড্রোন প্রযুক্তি, অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গোলাবারুদ যৌথভাবে উৎপাদন করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। এর ফলে উত্তর আফ্রিকায় তুরস্কের প্রভাব যেমন বাড়ছে, তেমনি আলজেরিয়ার সামরিক সক্ষমতাও নতুন মাত্রা পাচ্ছে। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এবং প্রেসিডেন্ট তেব্বুনের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক বিশ্বমঞ্চে বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যু এবং পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ক্ষেত্রে অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে আঙ্কারা ও আলজেরিয়া এখন একে অপরের প্রধান সহযোগী।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে বিদ্যমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের সাথে আলজেরিয়ার এই সক্রিয় অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ভূ-রাজনীতিতে ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রবিন্দু তৈরি করবে। এই জোট শক্তিশালী হলে তা এই অঞ্চলে ইসরায়েল-কেন্দ্রিক পশ্চিমা পরিকল্পনাগুলোর গতি কমিয়ে দিতে পারে। একই সাথে এটি আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং লোহিত সাগর সংলগ্ন এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। আলজেরিয়া ও তুরস্কের এই কৌশলগত মহাজোট কেবল দ্বিপক্ষীয় সমৃদ্ধিই আনবে না, বরং এটি একটি বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তথ্যের উৎস: ডেইলি সাবাহ

আপনার মতামত লিখুন