দিকপাল

আমিরাতের গোপন পরিকল্পনা: আরব দেশগুলোকে নিয়ে ইরানে হামলার চেষ্টা


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:৩৭ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

আমিরাতের গোপন পরিকল্পনা: আরব দেশগুলোকে নিয়ে ইরানে হামলার চেষ্টা

আমেরিকা এবং ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক তৎপরতার রেশ ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর অধ্যায়ের উন্মোচন হয়েছে। তেহরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে এবং তাদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আরব দেশগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার জোরদার চেষ্টা চালিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে আমিরাতের এই দূরহ ও সমন্বিত সামরিক হামলার পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি, কারণ সৌদি আরবসহ অঞ্চলের অন্যান্য প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এই উদ্যোগে সাড়া দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছে। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্যটি প্রকাশ্যে আনা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানকে কোণঠাসা করার এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান নিজে উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন আরব দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় যোগাযোগ করেছিলেন। এই তালিকায় সৌদি আরবের প্রভাবশালী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও ছিলেন, যার সমর্থন পাওয়াটা আমিরাতের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু রিয়াদের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া না আসায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুরো পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়। আর এই ঘটনার পর থেকে আরব দেশগুলোর পারস্পরিক আঞ্চলিক সম্পর্কে এক ধরনের নীরব টানাপোড়েন ও দূরত্বের তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর আন্তর্জাতিক জোট ওপেক এবং ওপেক প্লাস থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাময়িকভাবে সরে যাওয়ার যে সিদ্ধান্ত, তার পেছনেও এই রাজনৈতিক মতবিরোধ একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

ব্লুমবার্গের ভেতরের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, গত মার্চ মাসে সৌদি আরব যখন সরাসরি ইরানের মাটিতে সামরিক হামলা চালিয়েছিল, তখন পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। তবে পরবর্তীতে সেই সংঘাতের তীব্রতা কমাতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় যুদ্ধ এড়াতে পাকিস্তান যখন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন রিয়াদ নিজেদের কঠোর অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে আসে। সৌদি সরকার তখন বুঝতে পেরেছিল যে, সামরিক আগ্রাসনের চেয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি বজায় রাখা সম্ভব। ফলে তারা যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে, যা আমিরাতের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের সঙ্গে একেবারেই মেলেনি।

অন্য একদিক থেকে, এই যুদ্ধবিরতি এবং মধ্যস্থতার মূল প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা কেন্দ্রীয় ভূমিকা না দেওয়ায় দেশটির নীতিনির্ধারকরা চরম অসন্তুষ্ট ছিলেন। ঠিক একই সময়ে কাতারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাস লাফফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্রে একটি হামলার ঘটনা ঘটে। এই হামলার পর ক্ষুব্ধ হয়ে দোহাও প্রাথমিক পর্যায়ে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ও পাল্টা কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছিল। তবে পরবর্তীতে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসেব-নিকেশের পর কাতার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণ সরে আসে। উল্লেখ্য, রাস লাফফান হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র, যা গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে এক বিশাল ও অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই কাতার কোনোভাবেই এই অঞ্চলকে নতুন কোনো যুদ্ধের আগুনে ঠেলে দিতে চায়নি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির দাবি অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে এই ধরনের একটি সমন্বিত আরব সামরিক জোট গঠন এবং হামলার গোপন পরিকল্পনার বিষয়টি ওয়াশিংটন তথা আমেরিকার শীর্ষ প্রশাসন আগে থেকেই খুব ভালোভাবে জানত। শুধু তাই নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মূল লক্ষ্যই ছিল এই অভিযানে পরাশক্তি আমেরিকা এবং ধনী রাষ্ট্র কাতারকে সরাসরি ও সক্রিয়ভাবে নিজেদের পাশে টেনে নেওয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রিয়াদের অনীহা এবং দোহার পিছুটানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে ইরানবিরোধী এক বিশাল সামরিক ফ্রন্ট গঠনের আমিরাতি স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল।

তথ্যসূত্র: ব্লুমবার্গ

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬


আমিরাতের গোপন পরিকল্পনা: আরব দেশগুলোকে নিয়ে ইরানে হামলার চেষ্টা

প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬

featured Image

আমেরিকা এবং ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক তৎপরতার রেশ ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর অধ্যায়ের উন্মোচন হয়েছে। তেহরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে এবং তাদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আরব দেশগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার জোরদার চেষ্টা চালিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে আমিরাতের এই দূরহ ও সমন্বিত সামরিক হামলার পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি, কারণ সৌদি আরবসহ অঞ্চলের অন্যান্য প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এই উদ্যোগে সাড়া দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছে। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্যটি প্রকাশ্যে আনা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানকে কোণঠাসা করার এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান নিজে উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন আরব দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় যোগাযোগ করেছিলেন। এই তালিকায় সৌদি আরবের প্রভাবশালী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও ছিলেন, যার সমর্থন পাওয়াটা আমিরাতের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু রিয়াদের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া না আসায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুরো পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়। আর এই ঘটনার পর থেকে আরব দেশগুলোর পারস্পরিক আঞ্চলিক সম্পর্কে এক ধরনের নীরব টানাপোড়েন ও দূরত্বের তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর আন্তর্জাতিক জোট ওপেক এবং ওপেক প্লাস থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাময়িকভাবে সরে যাওয়ার যে সিদ্ধান্ত, তার পেছনেও এই রাজনৈতিক মতবিরোধ একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

ব্লুমবার্গের ভেতরের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, গত মার্চ মাসে সৌদি আরব যখন সরাসরি ইরানের মাটিতে সামরিক হামলা চালিয়েছিল, তখন পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। তবে পরবর্তীতে সেই সংঘাতের তীব্রতা কমাতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় যুদ্ধ এড়াতে পাকিস্তান যখন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন রিয়াদ নিজেদের কঠোর অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে আসে। সৌদি সরকার তখন বুঝতে পেরেছিল যে, সামরিক আগ্রাসনের চেয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি বজায় রাখা সম্ভব। ফলে তারা যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে, যা আমিরাতের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের সঙ্গে একেবারেই মেলেনি।

অন্য একদিক থেকে, এই যুদ্ধবিরতি এবং মধ্যস্থতার মূল প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা কেন্দ্রীয় ভূমিকা না দেওয়ায় দেশটির নীতিনির্ধারকরা চরম অসন্তুষ্ট ছিলেন। ঠিক একই সময়ে কাতারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাস লাফফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্রে একটি হামলার ঘটনা ঘটে। এই হামলার পর ক্ষুব্ধ হয়ে দোহাও প্রাথমিক পর্যায়ে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ও পাল্টা কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছিল। তবে পরবর্তীতে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসেব-নিকেশের পর কাতার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণ সরে আসে। উল্লেখ্য, রাস লাফফান হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র, যা গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে এক বিশাল ও অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই কাতার কোনোভাবেই এই অঞ্চলকে নতুন কোনো যুদ্ধের আগুনে ঠেলে দিতে চায়নি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির দাবি অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে এই ধরনের একটি সমন্বিত আরব সামরিক জোট গঠন এবং হামলার গোপন পরিকল্পনার বিষয়টি ওয়াশিংটন তথা আমেরিকার শীর্ষ প্রশাসন আগে থেকেই খুব ভালোভাবে জানত। শুধু তাই নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মূল লক্ষ্যই ছিল এই অভিযানে পরাশক্তি আমেরিকা এবং ধনী রাষ্ট্র কাতারকে সরাসরি ও সক্রিয়ভাবে নিজেদের পাশে টেনে নেওয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রিয়াদের অনীহা এবং দোহার পিছুটানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে ইরানবিরোধী এক বিশাল সামরিক ফ্রন্ট গঠনের আমিরাতি স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল।

তথ্যসূত্র: ব্লুমবার্গ


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল