ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধের রণকৌশল কেমন হবে, তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে এক নজিরবিহীন উত্তেজনাকর ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত মঙ্গলবার দুই নেতার এই দীর্ঘ কথোপকথনে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মধ্যকার গভীর মতপার্থক্য ও ক্ষোভ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে একজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিশ্বরাজনীতির এই দুই প্রভাবশালী নেতার মধ্যে এটিই একমাত্র যোগাযোগ ছিল না। জানা গেছে, গত রোববারও তাদের মধ্যে দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। সেই সময় ট্রাম্প বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই নেতানিয়াহুকে জানিয়েছিলেন যে, চলতি সপ্তাহের শুরুতেই মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর বড় ধরনের এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুভিত্তিক বিমান হামলা চালাতে যাচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক সদর দপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অত্যন্ত গোপনীয় এই সামরিক অভিযানের সম্ভাব্য নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন স্লেজহ্যামার’।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রের এই পুরো দৃশ্যপট আচমকা বদলে যায় মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে। ট্রাম্প আকস্মিকভাবেই ঘোষণা করেন যে, আপাতত মঙ্গলবার পরিকল্পিত এই বিধ্বংসী সামরিক হামলা স্থগিত করা হচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রভাবশালী আরব মিত্রদের বিশেষ অনুরোধ ও কূটনৈতিক চাপের মুখেই ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। এরপর থেকেই মূলত উপসাগরীয় দেশগুলো একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধানের রূপরেখা তৈরি করতে হোয়াইট হাউস এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের সাথে দিনরাত নিরলস যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।
এবারের এই কূটনৈতিক চুক্তির জোরদার প্রচেষ্টা প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বেশ রহস্যময় মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ইরান পরিস্থিতির বিষয়ে ওয়াশিংটন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করছে এবং খুব দ্রুতই এর ফলাফল দেখা যাবে। ট্রাম্প আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হয় ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন হবে, আর তা না হলে মার্কিন প্রশাসন এমন কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে যা খুবই অপ্রীতিকর ও ভয়াবহ হতে পারে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের মতো চরম পরিস্থিতি হয়তো এড়ানো সম্ভব হবে।
এদিকে ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক শান্ত ও কূটনৈতিক অবস্থান ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে চরমভাবে হতাশ এবং ক্ষুব্ধ করেছে। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই তেহরানের পারমাণবিক ও আঞ্চলিক প্রভাবের বিরুদ্ধে সরাসরি এবং বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে বিশ্বমঞ্চে ওকালতি করে আসছেন। ইসরাইলি ও মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, নেতানিয়াহুর স্পষ্ট যুক্তি ছিল—যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক বিলম্বের সিদ্ধান্ত কেবল ইরানিদেরই কৌশলগত সুবিধা দেবে এবং তারা নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার বাড়তি সময় পাবে।
মঙ্গলবার প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী চলা সেই ফোনালাপে নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে তার এই তীব্র অসন্তোষের কথা সরাসরি ব্যক্ত করেন। তিনি ট্রাম্পকে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, পূর্বপরিকল্পিত সামরিক হামলা পিছিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের একটি মস্ত বড় ভুল ছিল এবং প্রেসিডেন্টের উচিত ছিল কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ইরানের ওপর আঘাত হানা। নেতানিয়াহু এই আলাপে পুনরায় সামরিক অ্যাকশন শুরু করার জন্য ট্রাম্পের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেন। দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মতভেদ এখন প্রকাশ্য। ট্রাম্প যেখানে একটি আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে চান, সেখানে নেতানিয়াহু সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে তেহরানের পতন দেখতে মুখিয়ে আছেন।
এই ফোনালাপের পর থেকে ইসরাইলের সরকারি উচ্চ মহলে চরম উদ্বেগ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরাইলি প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, ট্রাম্প যেভাবে ইরানকে কূটনৈতিক আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করার সুযোগ দিচ্ছেন, তা ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্পের প্রথমে কঠোর হুমকি দেওয়া এবং পরে আলোচনার টেবিলে বসার এই কৌশল তেল আবিবের জন্য নতুন কিছু নয়। অতীতেও ওয়াশিংটন স্বীকার করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইরানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ও যুদ্ধনীতি এক নয়।
নেতানিয়াহুর এই ক্রমাগত যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং চাপের মুখে ট্রাম্প অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পুরো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ একমাত্র তারই হাতে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে তিনি কী বলেছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বেশ অহংকারের সুরে জানান, তিনি যা চাইবেন, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত তা-ই করতে বাধ্য হবেন। ট্রাম্প এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেই তার অবস্থান ধরে রেখেছেন এবং দাবি করেছেন যে, যদি কয়েকটা দিন সময় দিলে বহু মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়, তবে কূটনীতিকে সেই সুযোগ দেওয়া অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
অন্যদিক থেকে এই সংকটের সমান্তরাল কূটনৈতিক সমাধানের একটি বড় ভরসা হয়ে উঠেছে এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর দেশ পাকিস্তান। ইরানের রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের বরাতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেছেন যে, তেহরান ও ওয়াশিংটন এখনো পাকিস্তানের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছে। ইরানের মূল ১৪ দফার ওপর ভিত্তি করে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার উভয় পক্ষের মধ্যে চিঠিপত্র বিনিময় হয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো প্রস্তাবগুলো বর্তমানে তেহরানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করতে এবং একটি টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির আজ বৃহস্পতিবার বিশেষ সফরে তেহরান পৌঁছাবেন। ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার এই চরম সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজার ক্ষেত্রে পাকিস্তান যে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, তা এখন স্পষ্ট। এর আগে গত এপ্রিলে পাকিস্তানের বিশেষ উদ্যোগেই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের ঐতিহাসিক মুখোমুখি বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল।
তবে এত কিছুর পরেও দুই চিরবৈরী দেশের মধ্যকার মূল মতবিরোধগুলো কতটা কমে এসেছে তা নিয়ে এখনো আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে। আঞ্চলিক ভূরাজনীতির একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, ইরান তাদের প্রধান ও মৌলিক দাবিগুলো থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হঠেনি। বিশেষ করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালু রাখা এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকে অবরুদ্ধ থাকা ইরানি তহবিল মুক্ত করার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
একই সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ইরানকে চাপে রাখতে সামরিক হামলার বিকল্প পথটি এখনো পুরোপুরি খোলা রেখেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি আলোচনার টেবিলে ইরানের কাছ থেকে সঠিক ও সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়া যায়, তবে যেকোনো সময় মার্কিন সামরিক বাহিনী অ্যাকশনে যাবে। মার্কিন প্রশাসন সব দিক থেকেই যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক চরম নাটকীয় মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে চলছে শান্তির গোপন আড্ডা, আর অন্যদিকে বাজছে যুদ্ধের দামামা।
মূল সূত্র: সিএনএন (CNN)

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধের রণকৌশল কেমন হবে, তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে এক নজিরবিহীন উত্তেজনাকর ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত মঙ্গলবার দুই নেতার এই দীর্ঘ কথোপকথনে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মধ্যকার গভীর মতপার্থক্য ও ক্ষোভ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে একজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিশ্বরাজনীতির এই দুই প্রভাবশালী নেতার মধ্যে এটিই একমাত্র যোগাযোগ ছিল না। জানা গেছে, গত রোববারও তাদের মধ্যে দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। সেই সময় ট্রাম্প বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই নেতানিয়াহুকে জানিয়েছিলেন যে, চলতি সপ্তাহের শুরুতেই মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর বড় ধরনের এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুভিত্তিক বিমান হামলা চালাতে যাচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক সদর দপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অত্যন্ত গোপনীয় এই সামরিক অভিযানের সম্ভাব্য নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন স্লেজহ্যামার’।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রের এই পুরো দৃশ্যপট আচমকা বদলে যায় মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে। ট্রাম্প আকস্মিকভাবেই ঘোষণা করেন যে, আপাতত মঙ্গলবার পরিকল্পিত এই বিধ্বংসী সামরিক হামলা স্থগিত করা হচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রভাবশালী আরব মিত্রদের বিশেষ অনুরোধ ও কূটনৈতিক চাপের মুখেই ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। এরপর থেকেই মূলত উপসাগরীয় দেশগুলো একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধানের রূপরেখা তৈরি করতে হোয়াইট হাউস এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের সাথে দিনরাত নিরলস যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।
এবারের এই কূটনৈতিক চুক্তির জোরদার প্রচেষ্টা প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বেশ রহস্যময় মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ইরান পরিস্থিতির বিষয়ে ওয়াশিংটন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করছে এবং খুব দ্রুতই এর ফলাফল দেখা যাবে। ট্রাম্প আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হয় ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন হবে, আর তা না হলে মার্কিন প্রশাসন এমন কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে যা খুবই অপ্রীতিকর ও ভয়াবহ হতে পারে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের মতো চরম পরিস্থিতি হয়তো এড়ানো সম্ভব হবে।
এদিকে ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক শান্ত ও কূটনৈতিক অবস্থান ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে চরমভাবে হতাশ এবং ক্ষুব্ধ করেছে। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই তেহরানের পারমাণবিক ও আঞ্চলিক প্রভাবের বিরুদ্ধে সরাসরি এবং বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে বিশ্বমঞ্চে ওকালতি করে আসছেন। ইসরাইলি ও মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, নেতানিয়াহুর স্পষ্ট যুক্তি ছিল—যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক বিলম্বের সিদ্ধান্ত কেবল ইরানিদেরই কৌশলগত সুবিধা দেবে এবং তারা নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার বাড়তি সময় পাবে।
মঙ্গলবার প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী চলা সেই ফোনালাপে নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে তার এই তীব্র অসন্তোষের কথা সরাসরি ব্যক্ত করেন। তিনি ট্রাম্পকে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, পূর্বপরিকল্পিত সামরিক হামলা পিছিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের একটি মস্ত বড় ভুল ছিল এবং প্রেসিডেন্টের উচিত ছিল কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ইরানের ওপর আঘাত হানা। নেতানিয়াহু এই আলাপে পুনরায় সামরিক অ্যাকশন শুরু করার জন্য ট্রাম্পের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেন। দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মতভেদ এখন প্রকাশ্য। ট্রাম্প যেখানে একটি আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে চান, সেখানে নেতানিয়াহু সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে তেহরানের পতন দেখতে মুখিয়ে আছেন।
এই ফোনালাপের পর থেকে ইসরাইলের সরকারি উচ্চ মহলে চরম উদ্বেগ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরাইলি প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, ট্রাম্প যেভাবে ইরানকে কূটনৈতিক আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করার সুযোগ দিচ্ছেন, তা ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্পের প্রথমে কঠোর হুমকি দেওয়া এবং পরে আলোচনার টেবিলে বসার এই কৌশল তেল আবিবের জন্য নতুন কিছু নয়। অতীতেও ওয়াশিংটন স্বীকার করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইরানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ও যুদ্ধনীতি এক নয়।
নেতানিয়াহুর এই ক্রমাগত যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং চাপের মুখে ট্রাম্প অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পুরো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ একমাত্র তারই হাতে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে তিনি কী বলেছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বেশ অহংকারের সুরে জানান, তিনি যা চাইবেন, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত তা-ই করতে বাধ্য হবেন। ট্রাম্প এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেই তার অবস্থান ধরে রেখেছেন এবং দাবি করেছেন যে, যদি কয়েকটা দিন সময় দিলে বহু মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়, তবে কূটনীতিকে সেই সুযোগ দেওয়া অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
অন্যদিক থেকে এই সংকটের সমান্তরাল কূটনৈতিক সমাধানের একটি বড় ভরসা হয়ে উঠেছে এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর দেশ পাকিস্তান। ইরানের রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের বরাতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেছেন যে, তেহরান ও ওয়াশিংটন এখনো পাকিস্তানের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছে। ইরানের মূল ১৪ দফার ওপর ভিত্তি করে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার উভয় পক্ষের মধ্যে চিঠিপত্র বিনিময় হয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো প্রস্তাবগুলো বর্তমানে তেহরানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করতে এবং একটি টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির আজ বৃহস্পতিবার বিশেষ সফরে তেহরান পৌঁছাবেন। ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার এই চরম সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজার ক্ষেত্রে পাকিস্তান যে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, তা এখন স্পষ্ট। এর আগে গত এপ্রিলে পাকিস্তানের বিশেষ উদ্যোগেই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের ঐতিহাসিক মুখোমুখি বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল।
তবে এত কিছুর পরেও দুই চিরবৈরী দেশের মধ্যকার মূল মতবিরোধগুলো কতটা কমে এসেছে তা নিয়ে এখনো আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে। আঞ্চলিক ভূরাজনীতির একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, ইরান তাদের প্রধান ও মৌলিক দাবিগুলো থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হঠেনি। বিশেষ করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালু রাখা এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকে অবরুদ্ধ থাকা ইরানি তহবিল মুক্ত করার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
একই সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ইরানকে চাপে রাখতে সামরিক হামলার বিকল্প পথটি এখনো পুরোপুরি খোলা রেখেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি আলোচনার টেবিলে ইরানের কাছ থেকে সঠিক ও সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়া যায়, তবে যেকোনো সময় মার্কিন সামরিক বাহিনী অ্যাকশনে যাবে। মার্কিন প্রশাসন সব দিক থেকেই যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক চরম নাটকীয় মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে চলছে শান্তির গোপন আড্ডা, আর অন্যদিকে বাজছে যুদ্ধের দামামা।
মূল সূত্র: সিএনএন (CNN)

আপনার মতামত লিখুন