আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ বাহিনীর ব্যাপক বিমান হামলার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই নিজেদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে পেতে যাচ্ছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য তেহরানের এই অবিশ্বাস্য গতিতে ঘুরে দাঁড়ানো এখন চরম উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি তেহরানে ইসলামি বিপ্লবের সাতচল্লিশতম বার্ষিকী উদযাপনে দেশটির সেনাবাহিনীর বিশাল সমরাস্ত্র প্রদর্শনীর পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এক গোপন নথিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গত এপ্রিল মাসের শুরুতে কার্যকর হওয়া ছয় সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইরান তাদের ড্রোন উৎপাদন ও ক্ষেপণাস্ত্র পুনর্গঠনের কাজ পুরোদমে শুরু করে দিয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা পর্যালোচনার সঙ্গে যুক্ত একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব প্রাথমিক অনুমানে ইরানের যতটা সামরিক ক্ষতি হয়েছে বলে ভেবেছিল, তেহরান আসলে তার চেয়ে বহুগুণ দ্রুতগতিতে নিজেদের সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠন করছে।
এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মার্কিন ও ইসরাইলি বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, উৎক্ষেপণ যন্ত্র বা লঞ্চার এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো একেবারে নতুন করে যুদ্ধোপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। এর সরাসরি অর্থ হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি তার ঘোষণা অনুযায়ী আবারও ইরানের ওপর নতুন করে বিমান হামলা শুরু করেন, তবে ইরান এই অঞ্চলে আমেরিকার মিত্র দেশগুলোর জন্য একটি মহাতঙ্ক বা বড় ধরনের সামরিক হুমকি হয়েই আঘাত হানবে। একই সঙ্গে, বিগত মাসগুলোতে চালানো আমেরিকা ও ইসরাইলের রক্তক্ষয়ী হামলা দীর্ঘ মেয়াদে ইরানের সামরিক বাহিনীকে আদতে কতটা দুর্বল করতে পেরেছে, তা নিয়েও এখন খোদ পেন্টাগনের ভেতরেই বড় ধরনের প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে। পেন্টাগনের গোয়েন্দা হিসাব অনুযায়ী, আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ যে ইরানি ড্রোন, সেই ড্রোন বহর আগামী ছয় মাসের মধ্যেই তাদের পূর্বের শতভাগ সক্ষমতা ফিরে পাবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার হুমকি দিয়ে আসছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসানে তেহরান যদি আমেরিকার শর্তে চুক্তি না করে, তবে তিনি আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করবেন। এমনকি গত মঙ্গলবার তিনি প্রকাশ্য গণমাধ্যমে দাবি করেছিলেন যে, তিনি নতুন করে বোমাবর্ষণ শুরু করার সিদ্ধান্ত থেকে মাত্র এক ঘণ্টা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অর্থাৎ, যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং ইরানও তাদের এই সদ্য গোছানো সামরিক সক্ষমতা আমেরিকার বিরুদ্ধে পুরোদমে কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তবে পশ্চিমা সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণার চেয়েও ইরানের এই অলৌকিক গতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে মূলত কাজ করেছে পরাশক্তি রাশিয়া ও চীনের নেপথ্য সমর্থন। একই সাথে, আমেরিকা ও ইসরাইল এই যুদ্ধে ইরানের যে পরিমাণ ক্ষতি আশা করেছিল, কৌশলগত কারণে তেহরান সেই ক্ষতি অনেকটাই এড়াতে পেরেছে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে, তীব্র যুদ্ধ চলাকালেও চীন অত্যন্ত গোপনে ইরানকে এমন সব আধুনিক ও সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে, যা দিয়ে নিখুঁতভাবে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা যায়। যদিও পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর অবরোধের কারণে এই আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা মাঝেমধ্যে কিছুটা ব্যাহত হয়েছিল, কিন্তু তা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। গত সপ্তাহে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আমেরিকার একটি প্রভাবশালী টেলিভিশন নেটওয়ার্কের সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট অভিযোগ করেছিলেন যে, চীন পর্দার আড়াল থেকে ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ জোগান দিচ্ছে, যদিও তিনি কৌশলগত কারণে এই বিষয়ে বিস্তারিত কোনো প্রমাণ হাজির করেননি। অবশ্য বেইজিংয়ে নিযুক্ত চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ইসরাইলের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
চীনের এই অস্বীকৃতির পরেও সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা পর্যালোচনা বলছে, আমেরিকা ও ইসরাইলের ইতিহাসের অন্যতম সর্বাত্মক বিমান হামলার পরেও ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও আত্মঘাতী ড্রোনসহ মূল সামরিক শক্তিগুলো এখনো বেশ ভালোভাবেই বজায় রয়েছে। এই স্পর্শকাতর বিষয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের একজন মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হয়ে জানান যে, তারা সরকারিভাবে গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা করেন না। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, আমেরিকার সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং দেশের প্রেসিডেন্টের পছন্দমতো যেকোনো স্থানে ও যেকোনো সময়ে চূড়ান্ত সামরিক অভিযান চালানোর সব প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।
এদিকে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দাদের পূর্ববর্তী এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, ইরানের প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র বা লঞ্চার মার্কিন হামলা থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির পর পাওয়া সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই সংখ্যা বাড়িয়ে বলা হয়েছে যে, ইরানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ লঞ্চার এখনো সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে। কারণ, যুদ্ধবিরতির এই শান্ত সময়ে ইরান মার্কিন বোমায় মাটির নিচে চাপা পড়া বা গোপনে লুকিয়ে রাখা লঞ্চারগুলো অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। পেন্টাগনের ভেতরের খবর অনুযায়ী, হাজার হাজার অত্যাধুনিক ইরানি ড্রোন এখনো অক্ষত অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত আছে, যা তাদের যুদ্ধপূর্ব মোট ড্রোন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক বা পঞ্চাশ শতাংশ।
সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষামূলক ক্রুজ মিসাইলের একটি বড় অংশই মার্কিন হামলা থেকে বেঁচে গেছে, কারণ মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী ইরানের উপকূলীয় প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে বড় কোনো আক্রমণ চালায়নি। এসব ভয়ঙ্কর ক্রুজ মিসাইল মূলত বিশ্ববাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা বা হুমকি তৈরির জন্য ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ার। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতা সাময়িকভাবে কিছুটা কমিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি, বরং তারা হামলার পর দ্রুত নিজেদের পুনর্গঠন করে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে।
ইরানের এই অভাবনীয় পুনর্গঠনের আওতায় রয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তিক স্থাপনাগুলোও, যা প্রায় পুরোপুরি মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে গত মঙ্গলবার মার্কিন সংসদের উচ্চকক্ষ বা হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে দাবি করেছিলেন সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। তিনি বলেছিলেন, অপারেশন এপিক ফিউরি নামের মার্কিন সামরিক অভিযানটি ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পের নব্বই শতাংশ ধ্বংস করেছে, যার ফলে ইরান আগামী কয়েক বছর নিজেদের আর পুনর্গঠন করতে পারবে না। কিন্তু মার্কিন এই কমান্ডারের দেওয়া তথ্যের সাথে মাঠপর্যায়ের বাস্তব গোয়েন্দা মূল্যায়নের আকাশ-পাতাল তফাত দেখা যাচ্ছে। প্রকৃত সত্য হলো, মার্কিন বোমাবর্ষণে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের ক্ষতি বড়জোর কয়েক মাস পিছিয়ে গেছে মাত্র, কয়েক বছর নয়। ইরানের কিছু মূল সমরাস্ত্র কারখানা এখনো সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে, যা দেশটিকে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় মধ্যপ্রাচ্যের বুকে আবারও সামরিক পরাশক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহায্য করছে।
মূল সূত্র: সিএনএন (CNN) এবং রয়টার্স (Reuters)

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ বাহিনীর ব্যাপক বিমান হামলার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই নিজেদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে পেতে যাচ্ছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য তেহরানের এই অবিশ্বাস্য গতিতে ঘুরে দাঁড়ানো এখন চরম উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি তেহরানে ইসলামি বিপ্লবের সাতচল্লিশতম বার্ষিকী উদযাপনে দেশটির সেনাবাহিনীর বিশাল সমরাস্ত্র প্রদর্শনীর পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এক গোপন নথিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গত এপ্রিল মাসের শুরুতে কার্যকর হওয়া ছয় সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইরান তাদের ড্রোন উৎপাদন ও ক্ষেপণাস্ত্র পুনর্গঠনের কাজ পুরোদমে শুরু করে দিয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা পর্যালোচনার সঙ্গে যুক্ত একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব প্রাথমিক অনুমানে ইরানের যতটা সামরিক ক্ষতি হয়েছে বলে ভেবেছিল, তেহরান আসলে তার চেয়ে বহুগুণ দ্রুতগতিতে নিজেদের সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠন করছে।
এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মার্কিন ও ইসরাইলি বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, উৎক্ষেপণ যন্ত্র বা লঞ্চার এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো একেবারে নতুন করে যুদ্ধোপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। এর সরাসরি অর্থ হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি তার ঘোষণা অনুযায়ী আবারও ইরানের ওপর নতুন করে বিমান হামলা শুরু করেন, তবে ইরান এই অঞ্চলে আমেরিকার মিত্র দেশগুলোর জন্য একটি মহাতঙ্ক বা বড় ধরনের সামরিক হুমকি হয়েই আঘাত হানবে। একই সঙ্গে, বিগত মাসগুলোতে চালানো আমেরিকা ও ইসরাইলের রক্তক্ষয়ী হামলা দীর্ঘ মেয়াদে ইরানের সামরিক বাহিনীকে আদতে কতটা দুর্বল করতে পেরেছে, তা নিয়েও এখন খোদ পেন্টাগনের ভেতরেই বড় ধরনের প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে। পেন্টাগনের গোয়েন্দা হিসাব অনুযায়ী, আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ যে ইরানি ড্রোন, সেই ড্রোন বহর আগামী ছয় মাসের মধ্যেই তাদের পূর্বের শতভাগ সক্ষমতা ফিরে পাবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার হুমকি দিয়ে আসছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসানে তেহরান যদি আমেরিকার শর্তে চুক্তি না করে, তবে তিনি আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করবেন। এমনকি গত মঙ্গলবার তিনি প্রকাশ্য গণমাধ্যমে দাবি করেছিলেন যে, তিনি নতুন করে বোমাবর্ষণ শুরু করার সিদ্ধান্ত থেকে মাত্র এক ঘণ্টা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অর্থাৎ, যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং ইরানও তাদের এই সদ্য গোছানো সামরিক সক্ষমতা আমেরিকার বিরুদ্ধে পুরোদমে কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তবে পশ্চিমা সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণার চেয়েও ইরানের এই অলৌকিক গতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে মূলত কাজ করেছে পরাশক্তি রাশিয়া ও চীনের নেপথ্য সমর্থন। একই সাথে, আমেরিকা ও ইসরাইল এই যুদ্ধে ইরানের যে পরিমাণ ক্ষতি আশা করেছিল, কৌশলগত কারণে তেহরান সেই ক্ষতি অনেকটাই এড়াতে পেরেছে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে, তীব্র যুদ্ধ চলাকালেও চীন অত্যন্ত গোপনে ইরানকে এমন সব আধুনিক ও সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে, যা দিয়ে নিখুঁতভাবে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা যায়। যদিও পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর অবরোধের কারণে এই আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা মাঝেমধ্যে কিছুটা ব্যাহত হয়েছিল, কিন্তু তা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। গত সপ্তাহে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আমেরিকার একটি প্রভাবশালী টেলিভিশন নেটওয়ার্কের সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট অভিযোগ করেছিলেন যে, চীন পর্দার আড়াল থেকে ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ জোগান দিচ্ছে, যদিও তিনি কৌশলগত কারণে এই বিষয়ে বিস্তারিত কোনো প্রমাণ হাজির করেননি। অবশ্য বেইজিংয়ে নিযুক্ত চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ইসরাইলের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
চীনের এই অস্বীকৃতির পরেও সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা পর্যালোচনা বলছে, আমেরিকা ও ইসরাইলের ইতিহাসের অন্যতম সর্বাত্মক বিমান হামলার পরেও ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও আত্মঘাতী ড্রোনসহ মূল সামরিক শক্তিগুলো এখনো বেশ ভালোভাবেই বজায় রয়েছে। এই স্পর্শকাতর বিষয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের একজন মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হয়ে জানান যে, তারা সরকারিভাবে গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা করেন না। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, আমেরিকার সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং দেশের প্রেসিডেন্টের পছন্দমতো যেকোনো স্থানে ও যেকোনো সময়ে চূড়ান্ত সামরিক অভিযান চালানোর সব প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।
এদিকে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দাদের পূর্ববর্তী এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, ইরানের প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র বা লঞ্চার মার্কিন হামলা থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির পর পাওয়া সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই সংখ্যা বাড়িয়ে বলা হয়েছে যে, ইরানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ লঞ্চার এখনো সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে। কারণ, যুদ্ধবিরতির এই শান্ত সময়ে ইরান মার্কিন বোমায় মাটির নিচে চাপা পড়া বা গোপনে লুকিয়ে রাখা লঞ্চারগুলো অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। পেন্টাগনের ভেতরের খবর অনুযায়ী, হাজার হাজার অত্যাধুনিক ইরানি ড্রোন এখনো অক্ষত অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত আছে, যা তাদের যুদ্ধপূর্ব মোট ড্রোন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক বা পঞ্চাশ শতাংশ।
সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষামূলক ক্রুজ মিসাইলের একটি বড় অংশই মার্কিন হামলা থেকে বেঁচে গেছে, কারণ মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী ইরানের উপকূলীয় প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে বড় কোনো আক্রমণ চালায়নি। এসব ভয়ঙ্কর ক্রুজ মিসাইল মূলত বিশ্ববাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা বা হুমকি তৈরির জন্য ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ার। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতা সাময়িকভাবে কিছুটা কমিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি, বরং তারা হামলার পর দ্রুত নিজেদের পুনর্গঠন করে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে।
ইরানের এই অভাবনীয় পুনর্গঠনের আওতায় রয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তিক স্থাপনাগুলোও, যা প্রায় পুরোপুরি মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে গত মঙ্গলবার মার্কিন সংসদের উচ্চকক্ষ বা হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে দাবি করেছিলেন সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। তিনি বলেছিলেন, অপারেশন এপিক ফিউরি নামের মার্কিন সামরিক অভিযানটি ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পের নব্বই শতাংশ ধ্বংস করেছে, যার ফলে ইরান আগামী কয়েক বছর নিজেদের আর পুনর্গঠন করতে পারবে না। কিন্তু মার্কিন এই কমান্ডারের দেওয়া তথ্যের সাথে মাঠপর্যায়ের বাস্তব গোয়েন্দা মূল্যায়নের আকাশ-পাতাল তফাত দেখা যাচ্ছে। প্রকৃত সত্য হলো, মার্কিন বোমাবর্ষণে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের ক্ষতি বড়জোর কয়েক মাস পিছিয়ে গেছে মাত্র, কয়েক বছর নয়। ইরানের কিছু মূল সমরাস্ত্র কারখানা এখনো সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে, যা দেশটিকে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় মধ্যপ্রাচ্যের বুকে আবারও সামরিক পরাশক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহায্য করছে।
মূল সূত্র: সিএনএন (CNN) এবং রয়টার্স (Reuters)

আপনার মতামত লিখুন