দিকপাল

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘বড় হুমকি’ কিউবা—রুবিওর মন্তব্য


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬ | ০৭:৫৩ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘বড় হুমকি’ কিউবা—রুবিওর মন্তব্য

আমেরিকা এবং কিউবার মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরি সম্পর্ক এবার এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কিউবাকে একটি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে সরাসরি আখ্যায়িত করেছেন দেশটির নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। একই সাথে তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে হাভানার সাথে ওয়াশিংটনের কোনো ধরনের শান্তিপূর্ণ সমঝোতা বা চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। অবশ্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন কড়া মন্তব্যকে স্রেফ মিথ্যাচার বলে উড়িয়ে দিয়েছে কিউবা সরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কূটনৈতিক বাদানুবাদ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। ১৯৯৬ সালের একটি পুরনো ঘটনার জেরে কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনে মার্কিন প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় দুটি মার্কিন বিমান ভূপাতিত করে আমেরিকার নাগরিকদের হত্যা করা হয়েছিল। এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঠিক পরদিনই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন সবসময়ই আলোচনার মাধ্যমে একটি কূটনৈতিক সমাধান পছন্দ করে, তবে দেশের মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যেকোনো ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্ণ অধিকার ও আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শুধু তাই নয়, কিউবাকে এই অঞ্চলের সন্ত্রাসবাদের অন্যতম প্রধান মদদদাতা হিসেবেও কাঠগড়ায় দাঁড় করান তিনি।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই আক্রমণাত্মক বক্তব্যকে সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জোরালোভাবে দাবি করেন, কিউবা কখনোই আমেরিকার জন্য কোনো ধরনের হুমকির কারণ ছিল না। উল্টো তিনি ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, মার্কিন প্রশাসনই যুগের পর যুগ ধরে কিউবাকে ধ্বংস করতে নির্মম ও পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অবরোধ তৈরি করেছে এবং তাদের দেশে একটি সামরিক আগ্রাসন উসকে দেওয়ার অনবরত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে কিউবা ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তীব্র জ্বালানি সংকট, দিনের পর দিন দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং চরম খাদ্য সংকটে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। মার্কিন তেল অবরোধের কারণে এই সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে, আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন কিউবাকে নিজেদের শর্তে চুক্তিতে বাধ্য করতে ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছে। তবে এই চরম সংকটের মধ্যেও মানবিক দিক বিবেচনা করে মার্কিন প্রশাসনের দেওয়া দশ কোটি ডলারের একটি সহায়তা প্যাকেজ কিউবা গ্রহণ করেছে বলে নিশ্চিত করেছেন রুবিও।

এদিকে, কিউবার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান রাউল কাস্ত্রোকে কীভাবে আমেরিকার মাটিতে এনে আদালতের মুখোমুখি করা হবে, সেই বিষয়ে জানতে চাইলে মার্কিন প্রশাসন তাদের সুনির্দিষ্ট ও গোপন পরিকল্পনা প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। তবে মার্কিন ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ এক হুশিয়ারিতে বলেছেন, তারা আশা করছেন সাবেক এই নেতা নিজের ইচ্ছায় মার্কিন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, নতুবা অন্য যেকোনো উপায়ে তাকে ধরে এনে এখানে হাজির করা হবে।

এরই মধ্যে এই উত্তেজনার আঁচ এসে পড়েছে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও। ফ্লোরিডায় বসবাসরত আদিস লাস্ত্রেস মোরেরা নামের এক কিউবান নাগরিককে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আটক করেছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই নারী কিউবার অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী একটি শক্তিশালী সামরিক মহাজোটের শীর্ষ কর্মকর্তার বোন, যিনি ফ্লোরিডায় বসে গোপনে হাভানার কমিউনিস্ট সরকারকে বিভিন্নভাবে তথ্য ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করছিলেন। তাকে দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এই পুরো পরিস্থিতি নিয়ে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি কিউবাকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তার প্রশাসন মানবিক কারণে দেশটিকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে। পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সমালোচনা করে ট্রাম্প আরও যোগ করেন, বিগত ৫০ থেকে ৬০ বছর ধরে আগের শাসকেরা এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন, আর এখন এই ঐতিহাসিক দায়িত্বটি তার ওপর এসেছে এবং তিনি অত্যন্ত সফলভাবে এই সংকটের একটি চূড়ান্ত সমাধান করতে চান।


তথ্যসূত্র: বিবিসি

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬


যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘বড় হুমকি’ কিউবা—রুবিওর মন্তব্য

প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬

featured Image

আমেরিকা এবং কিউবার মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরি সম্পর্ক এবার এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কিউবাকে একটি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে সরাসরি আখ্যায়িত করেছেন দেশটির নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। একই সাথে তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে হাভানার সাথে ওয়াশিংটনের কোনো ধরনের শান্তিপূর্ণ সমঝোতা বা চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। অবশ্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন কড়া মন্তব্যকে স্রেফ মিথ্যাচার বলে উড়িয়ে দিয়েছে কিউবা সরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কূটনৈতিক বাদানুবাদ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। ১৯৯৬ সালের একটি পুরনো ঘটনার জেরে কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনে মার্কিন প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় দুটি মার্কিন বিমান ভূপাতিত করে আমেরিকার নাগরিকদের হত্যা করা হয়েছিল। এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঠিক পরদিনই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন সবসময়ই আলোচনার মাধ্যমে একটি কূটনৈতিক সমাধান পছন্দ করে, তবে দেশের মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যেকোনো ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্ণ অধিকার ও আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শুধু তাই নয়, কিউবাকে এই অঞ্চলের সন্ত্রাসবাদের অন্যতম প্রধান মদদদাতা হিসেবেও কাঠগড়ায় দাঁড় করান তিনি।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই আক্রমণাত্মক বক্তব্যকে সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জোরালোভাবে দাবি করেন, কিউবা কখনোই আমেরিকার জন্য কোনো ধরনের হুমকির কারণ ছিল না। উল্টো তিনি ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, মার্কিন প্রশাসনই যুগের পর যুগ ধরে কিউবাকে ধ্বংস করতে নির্মম ও পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অবরোধ তৈরি করেছে এবং তাদের দেশে একটি সামরিক আগ্রাসন উসকে দেওয়ার অনবরত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে কিউবা ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তীব্র জ্বালানি সংকট, দিনের পর দিন দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং চরম খাদ্য সংকটে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। মার্কিন তেল অবরোধের কারণে এই সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে, আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন কিউবাকে নিজেদের শর্তে চুক্তিতে বাধ্য করতে ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছে। তবে এই চরম সংকটের মধ্যেও মানবিক দিক বিবেচনা করে মার্কিন প্রশাসনের দেওয়া দশ কোটি ডলারের একটি সহায়তা প্যাকেজ কিউবা গ্রহণ করেছে বলে নিশ্চিত করেছেন রুবিও।

এদিকে, কিউবার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান রাউল কাস্ত্রোকে কীভাবে আমেরিকার মাটিতে এনে আদালতের মুখোমুখি করা হবে, সেই বিষয়ে জানতে চাইলে মার্কিন প্রশাসন তাদের সুনির্দিষ্ট ও গোপন পরিকল্পনা প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। তবে মার্কিন ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ এক হুশিয়ারিতে বলেছেন, তারা আশা করছেন সাবেক এই নেতা নিজের ইচ্ছায় মার্কিন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, নতুবা অন্য যেকোনো উপায়ে তাকে ধরে এনে এখানে হাজির করা হবে।

এরই মধ্যে এই উত্তেজনার আঁচ এসে পড়েছে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও। ফ্লোরিডায় বসবাসরত আদিস লাস্ত্রেস মোরেরা নামের এক কিউবান নাগরিককে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আটক করেছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই নারী কিউবার অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী একটি শক্তিশালী সামরিক মহাজোটের শীর্ষ কর্মকর্তার বোন, যিনি ফ্লোরিডায় বসে গোপনে হাভানার কমিউনিস্ট সরকারকে বিভিন্নভাবে তথ্য ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করছিলেন। তাকে দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এই পুরো পরিস্থিতি নিয়ে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি কিউবাকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তার প্রশাসন মানবিক কারণে দেশটিকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে। পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সমালোচনা করে ট্রাম্প আরও যোগ করেন, বিগত ৫০ থেকে ৬০ বছর ধরে আগের শাসকেরা এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন, আর এখন এই ঐতিহাসিক দায়িত্বটি তার ওপর এসেছে এবং তিনি অত্যন্ত সফলভাবে এই সংকটের একটি চূড়ান্ত সমাধান করতে চান।


তথ্যসূত্র: বিবিসি


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল