সমগ্র দেশ যখন এক বুক ক্ষোভ আর গভীর শোকে স্তব্ধ, তখন আবারও সামনে এলো এ দেশের নারী ও শিশু নির্যাতনের এক চরম নিষ্ঠুর এবং পৈশাচিক চিত্র। সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে সাত বছর বয়সী এক নিষ্পাপ ও ফুটফুটে শিশুকন্যা রামিসাকে প্রতিবেশী এক বিবাহিত যুবক যেভাবে পাশবিক নির্যাতনের পর নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, তা সভ্য সমাজের যেকোনো মানুষের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে এই ঘটনা নতুন কিছু নয়; দেশের আনাচে-কানাচে প্রায় প্রতিদিনই এমন গা শিউরে ওঠা বীভৎসতার খবর মিলছে। কেন এ দেশে অপরাধীরা শুধু অপরাধ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, বরং চরম হিংস্রতায় রূপ নিচ্ছে? এই সংকটের মূল উৎস খুঁজতে বিগত পাঁচ বছরের নির্ভরযোগ্য নথিপত্র এবং দেশী-বিদেশী পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে একটি বিশেষ অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। যেখানে অপরাধ বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকদের সাথে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর ও বৈজ্ঞানিক তথ্য বেরিয়ে এসেছে, যা নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণে বাধ্য করবে।
আমাদের সমাজে দিন দিন এই চিত্র কতটা ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে, তা সাম্প্রতিক অন্যান্য ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হয়। মানিকগঞ্জে এক শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অভিযুক্ত কিশোরের বাবা ও চাচাকে পিটিয়ে হত্যা করে। একই সময়ে রাজধানীর বনশ্রীর একটি মাদরাসা থেকে উদ্ধার করা হয় এক বলাৎকারের শিকার বালকের মরদেহ, যেখানে সন্দেহের তীর ওপরের শ্রেণির আরেক ছাত্রের দিকে। এমনকি চট্টগ্রামেও চার বছরের এক অবুঝ শিশু এমন পৈশাচিকতার শিকার হয়েছে। অথচ এই চরম ব্যাধি বা সামাজিক মহামারি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র কেবল গতানুগতিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের ওপরই পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে আছে; প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বিকল্প সামাজিক আন্দোলন বা দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। সাধারণত কোনো বড় ঘটনা ঘটলে দেশ জুড়ে তুমুল সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে নতুন কোনো ঘটনার ঘনঘটায় তা স্তিমিত হয়ে পড়ে।
এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতার গভীরতা বুঝতে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি ও স্পেনের নারী ও শিশু নির্যাতনের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে জনসংখ্যা ও অপরাধের হারের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়। এই চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ আলোচ্য দেশগুলোর চেয়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের তীব্রতা ও হিংস্রতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। একমাত্র ভারতের তুলনায় সংখ্যাগত দিক থেকে এ দেশের মামলার সংখ্যা কম মনে হলেও, জনসংখ্যার অনুপাত ও অপরাধের ধরনের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। ১৪৭ কোটি জনসংখ্যার ভারতে যেখানে বছরে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা চার লাখ ৪৫ হাজার ২৫৬টি, সেখানে মাত্র ১৮ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে সেই সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার ৭৬৬টি। অর্থাৎ জনসংখ্যার অনুপাত হিসাব করলে ভারতে অপরাধের হার বেশি হলেও ধর্ষণের পর পৈশাচিক কায়দায় হত্যার হার বাংলাদেশে তুলনামূলক অনেক বেশি। অন্যদিকে, ২৫ কোটি ৮৩ লাখ মানুষের দেশ পাকিস্তানে যেখানে বছরে ১০ হাজার ৭০১টি মামলা নথিভুক্ত হয়, একই সময়ে বাংলাদেশে এই মামলার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে অপরাধের হার প্রায় ২ দশমিক ৮৪ গুণ বেশি। তিন কোটি জনসংখ্যার দেশ নেপালে এই মামলার সংখ্যা মাত্র এক হাজার ৩৯৩টি এবং সাড়ে তিন কোটি মানুষের দেশ মালয়েশিয়ায় এই সংখ্যা সাত হাজার, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম।
দেশের অভ্যন্তরে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র দেখা গেছে ঢাকা বিভাগে। চার কোটি ৪২ লাখের বেশি জনসংখ্যার এই বিভাগে এক বছরেই নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে চার হাজার ৩৮৮টি। অথচ প্রায় সমান জনসংখ্যার দেশ স্পেনে যৌন সহিংসতার অভিযোগের সংখ্যা তিন হাজার ২৮৩টি, যার একটি বড় অংশ আবার ইন্টারনেটভিত্তিক হয়রানি। পাঁচ কোটি ৯০ লাখ জনসংখ্যার দেশ ইতালিতে বছরে মাত্র sechs হাজার আটশত ৫৭টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, যার সিংহভাগ অভিযোগই আবার দেশটিতে বসবাসরত বিদেশী নাগরিকদের বিরুদ্ধে। ২৮ কোটি ৭৩ লাখ জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিকায় ৩৬ হাজার ১৪টি এবং দুই কোটি ৩৫ লাখ মানুষের দেশ শ্রীলঙ্কায় মাত্র দুই হাজার ২০০টি নারী নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ কতটা নাজুক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে।
এই অনুসন্ধানে পুলিশ সদর দপ্তরের মামলার পরিসংখ্যান থেকে একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সারা দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে গরমকালে যৌন অপরাধের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায় এবং শীতকালে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে। শীত শেষ হওয়ার পর মার্চ মাসে যখন হালকা গরম পড়তে শুরু করে, তখন থেকেই এই অপরাধের গ্রাফ ওপরের দিকে উঠতে থাকে এবং নভেম্বর পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মাসিক পরিসংখ্যানও এই তথ্যের সত্যতা প্রমাণ করে। তাদের খতিয়ান অনুযায়ী, শীতের মাসগুলোতে যেখানে ধর্ষণের সংখ্যা ৩০ থেকে ৪৫ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, ঠিক মার্চ মাসে গরমের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথেই সেই সংখ্যা এক লাফে দ্বিগুণ বা তিন গুণেরও বেশি হয়ে যায়। এমনকি বিগত করোনাকালীনে যখন সারা দেশে অন্যান্য সাধারণ অপরাধের হার অনেক কম ছিল, তখনও দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা কমেনি, বরং বেড়ে ২২ হাজার পার হয়েছিল। ২০২০ সালে এই হার বৃদ্ধির পর ২০২১ সালে আইন মন্ত্রণালয় থেকে সারা দেশের বিচারক ও কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়েছিল, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সেই সভার পর কাজ আর এক কদমও এগোয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও কোনো সরকারই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের লাগাম টানতে পারেনি, যার ফলে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৩ জনেরও বেশি নারী ও শিশু এই নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে।
আবহাওয়ার সাথে অপরাধের এই অদ্ভুত সংযোগের বিষয়টি গবেষণায়ও প্রমাণিত হয়েছে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষকেরা জানিয়েছেন, তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও অতিরিক্ত আর্দ্রতার সময়ে মানুষের শরীরে বিশেষ হরমোনের পরিবর্তন ঘটে, যা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আচরণে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে গরমকালে মানুষের পারস্পরিক সহনশীলতা বা মেজাজ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায় এবং এক ধরনের আগ্রাসী মনোভাব তৈরি হয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দিনের বেলা সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে এই ধরনের অপরাধ সংঘটনের হার সবচেয়ে বেশি, যা সম্পূর্ণ আবহাওয়াজনিত কারণে ঘটে থাকে। চিকিৎসকেরা ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, বর্তমান প্রযুক্তির যুগে শিশুদের হাতে অবাধে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়া এবং পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতার কারণে কম বয়সীদের মধ্যেও এই ধরনের বিকৃত মানসিকতা ও যৌনতার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে অষ্টম বা নবম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে প্রাতিষ্ঠানিক যৌন শিক্ষার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা হয়, আমাদের সমাজে এই বিষয়গুলো লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে রাখার ফলে শিশুরা সঠিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং মানসিকভাবে সুস্থ কোনো লোক এই ধরনের পৈশাচিকতায় জড়াতে পারে না বলেই চিকিৎসকেরা মনে করেন।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এই ধরনের অপরাধ দমনে কেবল কঠোর আইনই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষামূলক ও সামাজিক কর্মসূচি নেওয়া হয়ে থাকে। যেমন ইতালিতে এক ছাত্রীকে হত্যার ঘটনার পর পুরো দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হলে দেশটির সরকার স্কুলপর্যায়ে ‘নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা’ প্রদর্শন বিষয়ক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে দেয়। স্পেনের আইনি প্রতিবেদনেও পর্যাপ্ত নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাব এবং ইন্টারনেটের অপব্যবহারকে কিশোর অপরাধের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তা মোকাবিলায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে ১৯৯৫ সালের ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ড কিংবা পরবর্তীতে ২০১৬ সালে কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনুর মতো বহু চাঞ্চল্যকর ঘটনার পরও সমাজকে সচেতন করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা এবং সাবেক পুলিশ কর্তারা মনে করছেন, কেবল আইন কঠোর করে বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে এই সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করা, স্কুল পর্যায় থেকেই নৈতিকতা ও লিঙ্গ সংবেদনশীল আচরণ শেখানো, পর্নোগ্রাফি সাইটগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা এবং সর্বোপরি পাড়া-মহল্লায় জোরালো সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তা না হলে বিচার процессов দীর্ঘসূত্রতা এবং তথ্য-প্রমাণের অভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে এবং সমাজের এই অন্ধকার দূর করা কখনোই সম্ভব হবে না।
যদিও সরকারের নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার, জাতীয় হেল্পলাইন এবং ডিএনএ ল্যাবরেটরির মতো বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ চালু রয়েছে, তবে অপরাধের শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে সামগ্রিক মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন ও পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
সমগ্র দেশ যখন এক বুক ক্ষোভ আর গভীর শোকে স্তব্ধ, তখন আবারও সামনে এলো এ দেশের নারী ও শিশু নির্যাতনের এক চরম নিষ্ঠুর এবং পৈশাচিক চিত্র। সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে সাত বছর বয়সী এক নিষ্পাপ ও ফুটফুটে শিশুকন্যা রামিসাকে প্রতিবেশী এক বিবাহিত যুবক যেভাবে পাশবিক নির্যাতনের পর নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, তা সভ্য সমাজের যেকোনো মানুষের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে এই ঘটনা নতুন কিছু নয়; দেশের আনাচে-কানাচে প্রায় প্রতিদিনই এমন গা শিউরে ওঠা বীভৎসতার খবর মিলছে। কেন এ দেশে অপরাধীরা শুধু অপরাধ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, বরং চরম হিংস্রতায় রূপ নিচ্ছে? এই সংকটের মূল উৎস খুঁজতে বিগত পাঁচ বছরের নির্ভরযোগ্য নথিপত্র এবং দেশী-বিদেশী পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে একটি বিশেষ অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। যেখানে অপরাধ বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকদের সাথে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর ও বৈজ্ঞানিক তথ্য বেরিয়ে এসেছে, যা নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণে বাধ্য করবে।
আমাদের সমাজে দিন দিন এই চিত্র কতটা ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে, তা সাম্প্রতিক অন্যান্য ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হয়। মানিকগঞ্জে এক শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অভিযুক্ত কিশোরের বাবা ও চাচাকে পিটিয়ে হত্যা করে। একই সময়ে রাজধানীর বনশ্রীর একটি মাদরাসা থেকে উদ্ধার করা হয় এক বলাৎকারের শিকার বালকের মরদেহ, যেখানে সন্দেহের তীর ওপরের শ্রেণির আরেক ছাত্রের দিকে। এমনকি চট্টগ্রামেও চার বছরের এক অবুঝ শিশু এমন পৈশাচিকতার শিকার হয়েছে। অথচ এই চরম ব্যাধি বা সামাজিক মহামারি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র কেবল গতানুগতিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের ওপরই পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে আছে; প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বিকল্প সামাজিক আন্দোলন বা দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। সাধারণত কোনো বড় ঘটনা ঘটলে দেশ জুড়ে তুমুল সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে নতুন কোনো ঘটনার ঘনঘটায় তা স্তিমিত হয়ে পড়ে।
এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতার গভীরতা বুঝতে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি ও স্পেনের নারী ও শিশু নির্যাতনের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে জনসংখ্যা ও অপরাধের হারের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়। এই চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ আলোচ্য দেশগুলোর চেয়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের তীব্রতা ও হিংস্রতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। একমাত্র ভারতের তুলনায় সংখ্যাগত দিক থেকে এ দেশের মামলার সংখ্যা কম মনে হলেও, জনসংখ্যার অনুপাত ও অপরাধের ধরনের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। ১৪৭ কোটি জনসংখ্যার ভারতে যেখানে বছরে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা চার লাখ ৪৫ হাজার ২৫৬টি, সেখানে মাত্র ১৮ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে সেই সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার ৭৬৬টি। অর্থাৎ জনসংখ্যার অনুপাত হিসাব করলে ভারতে অপরাধের হার বেশি হলেও ধর্ষণের পর পৈশাচিক কায়দায় হত্যার হার বাংলাদেশে তুলনামূলক অনেক বেশি। অন্যদিকে, ২৫ কোটি ৮৩ লাখ মানুষের দেশ পাকিস্তানে যেখানে বছরে ১০ হাজার ৭০১টি মামলা নথিভুক্ত হয়, একই সময়ে বাংলাদেশে এই মামলার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে অপরাধের হার প্রায় ২ দশমিক ৮৪ গুণ বেশি। তিন কোটি জনসংখ্যার দেশ নেপালে এই মামলার সংখ্যা মাত্র এক হাজার ৩৯৩টি এবং সাড়ে তিন কোটি মানুষের দেশ মালয়েশিয়ায় এই সংখ্যা সাত হাজার, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম।
দেশের অভ্যন্তরে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র দেখা গেছে ঢাকা বিভাগে। চার কোটি ৪২ লাখের বেশি জনসংখ্যার এই বিভাগে এক বছরেই নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে চার হাজার ৩৮৮টি। অথচ প্রায় সমান জনসংখ্যার দেশ স্পেনে যৌন সহিংসতার অভিযোগের সংখ্যা তিন হাজার ২৮৩টি, যার একটি বড় অংশ আবার ইন্টারনেটভিত্তিক হয়রানি। পাঁচ কোটি ৯০ লাখ জনসংখ্যার দেশ ইতালিতে বছরে মাত্র sechs হাজার আটশত ৫৭টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, যার সিংহভাগ অভিযোগই আবার দেশটিতে বসবাসরত বিদেশী নাগরিকদের বিরুদ্ধে। ২৮ কোটি ৭৩ লাখ জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিকায় ৩৬ হাজার ১৪টি এবং দুই কোটি ৩৫ লাখ মানুষের দেশ শ্রীলঙ্কায় মাত্র দুই হাজার ২০০টি নারী নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ কতটা নাজুক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে।
এই অনুসন্ধানে পুলিশ সদর দপ্তরের মামলার পরিসংখ্যান থেকে একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সারা দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে গরমকালে যৌন অপরাধের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায় এবং শীতকালে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে। শীত শেষ হওয়ার পর মার্চ মাসে যখন হালকা গরম পড়তে শুরু করে, তখন থেকেই এই অপরাধের গ্রাফ ওপরের দিকে উঠতে থাকে এবং নভেম্বর পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মাসিক পরিসংখ্যানও এই তথ্যের সত্যতা প্রমাণ করে। তাদের খতিয়ান অনুযায়ী, শীতের মাসগুলোতে যেখানে ধর্ষণের সংখ্যা ৩০ থেকে ৪৫ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, ঠিক মার্চ মাসে গরমের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথেই সেই সংখ্যা এক লাফে দ্বিগুণ বা তিন গুণেরও বেশি হয়ে যায়। এমনকি বিগত করোনাকালীনে যখন সারা দেশে অন্যান্য সাধারণ অপরাধের হার অনেক কম ছিল, তখনও দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা কমেনি, বরং বেড়ে ২২ হাজার পার হয়েছিল। ২০২০ সালে এই হার বৃদ্ধির পর ২০২১ সালে আইন মন্ত্রণালয় থেকে সারা দেশের বিচারক ও কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়েছিল, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সেই সভার পর কাজ আর এক কদমও এগোয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও কোনো সরকারই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের লাগাম টানতে পারেনি, যার ফলে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৩ জনেরও বেশি নারী ও শিশু এই নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে।
আবহাওয়ার সাথে অপরাধের এই অদ্ভুত সংযোগের বিষয়টি গবেষণায়ও প্রমাণিত হয়েছে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষকেরা জানিয়েছেন, তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও অতিরিক্ত আর্দ্রতার সময়ে মানুষের শরীরে বিশেষ হরমোনের পরিবর্তন ঘটে, যা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আচরণে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে গরমকালে মানুষের পারস্পরিক সহনশীলতা বা মেজাজ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায় এবং এক ধরনের আগ্রাসী মনোভাব তৈরি হয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দিনের বেলা সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে এই ধরনের অপরাধ সংঘটনের হার সবচেয়ে বেশি, যা সম্পূর্ণ আবহাওয়াজনিত কারণে ঘটে থাকে। চিকিৎসকেরা ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, বর্তমান প্রযুক্তির যুগে শিশুদের হাতে অবাধে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়া এবং পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতার কারণে কম বয়সীদের মধ্যেও এই ধরনের বিকৃত মানসিকতা ও যৌনতার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে অষ্টম বা নবম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে প্রাতিষ্ঠানিক যৌন শিক্ষার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা হয়, আমাদের সমাজে এই বিষয়গুলো লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে রাখার ফলে শিশুরা সঠিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং মানসিকভাবে সুস্থ কোনো লোক এই ধরনের পৈশাচিকতায় জড়াতে পারে না বলেই চিকিৎসকেরা মনে করেন।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এই ধরনের অপরাধ দমনে কেবল কঠোর আইনই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষামূলক ও সামাজিক কর্মসূচি নেওয়া হয়ে থাকে। যেমন ইতালিতে এক ছাত্রীকে হত্যার ঘটনার পর পুরো দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হলে দেশটির সরকার স্কুলপর্যায়ে ‘নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা’ প্রদর্শন বিষয়ক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে দেয়। স্পেনের আইনি প্রতিবেদনেও পর্যাপ্ত নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাব এবং ইন্টারনেটের অপব্যবহারকে কিশোর অপরাধের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তা মোকাবিলায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে ১৯৯৫ সালের ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ড কিংবা পরবর্তীতে ২০১৬ সালে কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনুর মতো বহু চাঞ্চল্যকর ঘটনার পরও সমাজকে সচেতন করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা এবং সাবেক পুলিশ কর্তারা মনে করছেন, কেবল আইন কঠোর করে বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে এই সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করা, স্কুল পর্যায় থেকেই নৈতিকতা ও লিঙ্গ সংবেদনশীল আচরণ শেখানো, পর্নোগ্রাফি সাইটগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা এবং সর্বোপরি পাড়া-মহল্লায় জোরালো সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তা না হলে বিচার процессов দীর্ঘসূত্রতা এবং তথ্য-প্রমাণের অভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে এবং সমাজের এই অন্ধকার দূর করা কখনোই সম্ভব হবে না।
যদিও সরকারের নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার, জাতীয় হেল্পলাইন এবং ডিএনএ ল্যাবরেটরির মতো বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ চালু রয়েছে, তবে অপরাধের শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে সামগ্রিক মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন ও পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

আপনার মতামত লিখুন