দিকপাল

ঘুষচক্রের কবলে নাজুক হয়ে উঠছে জনজীবন


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬ | ০৮:৩৮ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ঘুষচক্রের কবলে নাজুক হয়ে উঠছে জনজীবন

একটি মানুষের ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে শুরু করে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত, প্রতিটি ধাপে ‘ঘুষ’ যেন এক সংক্রামক ও মরণব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সমাজে ঘুষ ছাড়া কোনো সাধারণ কাজ সম্পন্ন হওয়া যেন এক অলীক কল্পনা। শিশুর জন্মসনদ থেকে শুরু করে মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ কিংবা উত্তরাধিকারীদের ওয়ারিশ কাগুজে প্রমাণপত্র জোগাড় করতেও সরকারের নির্ধারিত ফি-র বাইরে বিপুল অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে বাধ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষ। নাগরিকের মৌলিক ও আইনি অধিকার পাওয়ার প্রায় প্রতিটি খাত এখন এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং দালালের দুর্নীতির চক্রে পুরোপুরি বন্দি হয়ে পড়েছে। এর ফলে দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এক চরম ভোগান্তিময় ও দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি শিশুর জন্মের পর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হলো ‘জন্মনিবন্ধন সনদ’। অত্যন্ত সাধারণ ও প্রয়োজনীয় এই নথিটি তুলতে গিয়েও দেশের প্রতিটি প্রান্তে মানুষকে পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন ভোগান্তি। সরকারি ফি নামমাত্র বা সামান্য হলেও, দালালের দৌরাত্ম্য আর আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের গোপন যোগসাজশে কয়েক গুণ বাড়তি টাকা গুনতে হয়। একইভাবে, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীদের জন্য ‘মৃত্যুসনদ’ বা ‘ওয়ারিশ সনদ’ নিতে গেলেও পোহাতে হয় একই রকমের বিড়ম্বনা। টাকা ছাড়া ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে নড়ে না—এমন এক অঘোষিত ও নির্মম নিয়ম চালু হয়েছে দেশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, যারা এই ওপেন সিক্রেট ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত, তাদের অনতিবিলম্বে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার সুস্পষ্ট ও কঠোর ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ঘুষবাণিজ্যই নয়, বরং চাঁদাবাজি ও কমিশন বাণিজ্য পূর্ববর্তী সময়ের মতো বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও সমানতালে চলছে। সাধারণ জনগণ আশা করেছিল যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হয়তো এই ঘুষ ও চাঁদাবাজি বন্ধ হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি কঠোর ও দৃশ্যমান অবস্থান নেওয়া হবে। রাষ্ট্রযন্ত্রের যে আইনি সক্ষমতা আছে, সেটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলেই এই সব অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না, কারণ এই ঘুষবাণিজ্যের মাধ্যমে যারা প্রতিনিয়ত লাভবান হচ্ছে, তারা কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে জড়িত। তারা আমলাতন্ত্র, রাজনীতি কিংবা সামাজিক যেকোনো মানদণ্ডেই অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাই সরকারের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে অবিলম্বে কঠোর বার্তা দিতে হবে। দেশের এই প্রশাসনিক অনিয়ম এখন সম্পূর্ণ লাগামছাড়া হয়ে গেছে, যা এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না হলে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

সাধারণ মানুষের জন্য আরও একটি বড় ভুক্তভোগী খাত হলো পাসপোর্ট অফিস এবং জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন কেন্দ্র। একটি পাসপোর্ট তৈরি বা জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আবেদনপত্রে সামান্য ভুলের অজুহাত দেখিয়ে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের দিনের পর দিন ঘোরানো হয়। তারপর মোটা অঙ্কের টাকা দালালের হাতে না দেওয়া পর্যন্ত সেই সমস্যার কোনো সমাধান মেলে না। যাত্রাবাড়ী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দালাল ছাড়া কোনো আবেদনপত্র সরাসরি কাউন্টারে জমা দিতে গেলে কর্মকর্তাদের নানা ধরনের অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। আবেদনপত্র দফায় দফায় সংশোধন করে আনলেও কর্মকর্তাদের মনঃপূত হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই অতিরিক্ত টাকা খরচ করে দালালের দ্বারস্থ হন। সেখানে সাধারণ সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের নির্ধারিত ফি-র বাইরে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি দাবি করা হয়। আর বয়স পরিবর্তন বা নতুন পরিচয়পত্র অনুসারে পাসপোর্ট করার মতো বড় ভুলের ক্ষেত্রে দালালরা পঞ্চাশ হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। কদমতলী এলাকা থেকে আসা এক সেবা প্রত্যাশী জানান, তার সঠিক আবেদনপত্রটি প্রথমে কাউন্টার থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি নিরুপায় হয়ে অফিসের মূল গেটের সামনে এক দালালকে দুই হাজার টাকা দেন এবং দালালের ইশারায় পুনরায় লাইনে দাঁড়িয়ে কোনো বাধা ছাড়াই আবেদনটি জমা দিতে সক্ষম হন।

শুধু পাসপোর্ট বা জন্মনিবন্ধন অফিসই নয়, সরকারি হাসপাতালগুলোতেও সাধারণ মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম ও হয়রানির মুখে পড়ছেন। হাসপাতালের বেড বরাদ্দ, জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অপারেশনের সিরিয়াল কিংবা অ্যাম্বুলেন্স সেবার ক্ষেত্রেও প্রকাশ্যেই অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হচ্ছে। এমনকি সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়ার জন্য ওয়ার্ডবয়ের হাতে টাকা না দিলে বেড পাওয়া যায় না, আর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ বেড পাওয়া তো এখন সাধারণ মানুষের জন্য সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের রেজিস্ট্রি অফিস, ভূমি অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়গুলোতে ঘুষ নেওয়া হচ্ছে এক প্রকার বুক ফুলিয়েই। জমির নামজারি, খতিয়ান সংশোধন কিংবা দলিল নিবন্ধনে নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়াও দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। জমি কেনাবেচা বা মিউটেশনের মতো কাজে ঘুষ ছাড়া ফাইল অনুমোদন পাওয়া যেন অলীক কল্পনা। তেজগাঁও ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে আসা খিলগাঁও এলাকার এক ভুক্তভোগী জানান, সরকারি ফি-র বাইরে তার কাছে বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়েছিল, পরবর্তীতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দেনদরবার করে উপরি টাকা দিয়েই তাকে নিজের জমির কাজ হাসিল করতে হয়েছে।

ঢাকার মিরবাগের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন তার ছেলের জন্মনিবন্ধন করার জন্য মহাখালী ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক অফিসে গিয়ে আবেদন করেন। সাধারণ নিয়মে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এই কাজ হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। পরে অফিসের বাইরে এক কম্পিউটার দোকানির সঙ্গে ১২০০ টাকার চুক্তি করার পর মাত্র এক দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধনটি হাতে পান। সেখানে সেবা নিতে আসা সুরাইয়া বেগম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘জন্ম থেকে শুরু করে মরার পরও যে এই দেশে মানুষের শান্তি নেই, তা এই অফিসে না আসলে বুঝতাম না। সামান্য একটা ভুলের জন্য তিন মাস ধরে ঘুরছি, শেষ পর্যন্ত দালালের হাতে বাড়তি টাকা দেওয়ার পরেই কাজটা হলো।’

এই চরম অব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নাগরিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই জঘন্য ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ করতে সরকারকে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যারা এই সব অনৈতিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের চাকরিচ্যুতিসহ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং একই সঙ্গে দেশের নাগরিকদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে আরও বলেন, এত বড় গণঅভ্যুত্থান ও পরিবর্তনের পরও যদি আমাদের সেই পুরাতন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার্থেই ফিরে যেতে হয়, তাহলে দেশের এত শত শহীদের আত্মত্যাগ সম্পূর্ণ বৃথা হয়ে যাবে।

এছাড়া বিআরটিএ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে হলে কিংবা নতুন গাড়ির নিবন্ধন নিতে হলে ঘুষ দেওয়াটা এখন একটি অলিখিত ও বাধ্যতামূলক নিয়মে পরিণত হয়েছে। একইভাবে বহুতল ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি কিংবা মিউটেশন করতে গেলেও নানা ধরনের কাগজের অজুহাতে গ্রাহকদের হয়রানি করা হচ্ছে। এই সব বড় সেবার বাইরেও গ্রামীণ জনপদে অবিবাহিত বা বিধবা সনদপত্র, ভূমিহীন ও দুস্থদের তালিকা প্রণয়ন, বয়স্ক ও অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার আবেদন, মুক্তিযোদ্ধা ভাতার আবেদন, ভিজিডি বা সরকারি চালের কার্ড সেবা এবং ক্ষুদ্র ঋণের সহায়তা পেতে গেলেও স্থানীয় প্রভাবশালী ও কর্মচারীদের ঘুষ দিতে হচ্ছে, যা দেশের সুশাসনকে এক চরম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬


ঘুষচক্রের কবলে নাজুক হয়ে উঠছে জনজীবন

প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬

featured Image

একটি মানুষের ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে শুরু করে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত, প্রতিটি ধাপে ‘ঘুষ’ যেন এক সংক্রামক ও মরণব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সমাজে ঘুষ ছাড়া কোনো সাধারণ কাজ সম্পন্ন হওয়া যেন এক অলীক কল্পনা। শিশুর জন্মসনদ থেকে শুরু করে মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ কিংবা উত্তরাধিকারীদের ওয়ারিশ কাগুজে প্রমাণপত্র জোগাড় করতেও সরকারের নির্ধারিত ফি-র বাইরে বিপুল অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে বাধ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষ। নাগরিকের মৌলিক ও আইনি অধিকার পাওয়ার প্রায় প্রতিটি খাত এখন এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং দালালের দুর্নীতির চক্রে পুরোপুরি বন্দি হয়ে পড়েছে। এর ফলে দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এক চরম ভোগান্তিময় ও দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি শিশুর জন্মের পর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হলো ‘জন্মনিবন্ধন সনদ’। অত্যন্ত সাধারণ ও প্রয়োজনীয় এই নথিটি তুলতে গিয়েও দেশের প্রতিটি প্রান্তে মানুষকে পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন ভোগান্তি। সরকারি ফি নামমাত্র বা সামান্য হলেও, দালালের দৌরাত্ম্য আর আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের গোপন যোগসাজশে কয়েক গুণ বাড়তি টাকা গুনতে হয়। একইভাবে, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীদের জন্য ‘মৃত্যুসনদ’ বা ‘ওয়ারিশ সনদ’ নিতে গেলেও পোহাতে হয় একই রকমের বিড়ম্বনা। টাকা ছাড়া ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে নড়ে না—এমন এক অঘোষিত ও নির্মম নিয়ম চালু হয়েছে দেশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, যারা এই ওপেন সিক্রেট ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত, তাদের অনতিবিলম্বে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার সুস্পষ্ট ও কঠোর ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ঘুষবাণিজ্যই নয়, বরং চাঁদাবাজি ও কমিশন বাণিজ্য পূর্ববর্তী সময়ের মতো বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও সমানতালে চলছে। সাধারণ জনগণ আশা করেছিল যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হয়তো এই ঘুষ ও চাঁদাবাজি বন্ধ হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি কঠোর ও দৃশ্যমান অবস্থান নেওয়া হবে। রাষ্ট্রযন্ত্রের যে আইনি সক্ষমতা আছে, সেটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলেই এই সব অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না, কারণ এই ঘুষবাণিজ্যের মাধ্যমে যারা প্রতিনিয়ত লাভবান হচ্ছে, তারা কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে জড়িত। তারা আমলাতন্ত্র, রাজনীতি কিংবা সামাজিক যেকোনো মানদণ্ডেই অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাই সরকারের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে অবিলম্বে কঠোর বার্তা দিতে হবে। দেশের এই প্রশাসনিক অনিয়ম এখন সম্পূর্ণ লাগামছাড়া হয়ে গেছে, যা এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না হলে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

সাধারণ মানুষের জন্য আরও একটি বড় ভুক্তভোগী খাত হলো পাসপোর্ট অফিস এবং জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন কেন্দ্র। একটি পাসপোর্ট তৈরি বা জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আবেদনপত্রে সামান্য ভুলের অজুহাত দেখিয়ে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের দিনের পর দিন ঘোরানো হয়। তারপর মোটা অঙ্কের টাকা দালালের হাতে না দেওয়া পর্যন্ত সেই সমস্যার কোনো সমাধান মেলে না। যাত্রাবাড়ী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দালাল ছাড়া কোনো আবেদনপত্র সরাসরি কাউন্টারে জমা দিতে গেলে কর্মকর্তাদের নানা ধরনের অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। আবেদনপত্র দফায় দফায় সংশোধন করে আনলেও কর্মকর্তাদের মনঃপূত হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই অতিরিক্ত টাকা খরচ করে দালালের দ্বারস্থ হন। সেখানে সাধারণ সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের নির্ধারিত ফি-র বাইরে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি দাবি করা হয়। আর বয়স পরিবর্তন বা নতুন পরিচয়পত্র অনুসারে পাসপোর্ট করার মতো বড় ভুলের ক্ষেত্রে দালালরা পঞ্চাশ হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। কদমতলী এলাকা থেকে আসা এক সেবা প্রত্যাশী জানান, তার সঠিক আবেদনপত্রটি প্রথমে কাউন্টার থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি নিরুপায় হয়ে অফিসের মূল গেটের সামনে এক দালালকে দুই হাজার টাকা দেন এবং দালালের ইশারায় পুনরায় লাইনে দাঁড়িয়ে কোনো বাধা ছাড়াই আবেদনটি জমা দিতে সক্ষম হন।

শুধু পাসপোর্ট বা জন্মনিবন্ধন অফিসই নয়, সরকারি হাসপাতালগুলোতেও সাধারণ মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম ও হয়রানির মুখে পড়ছেন। হাসপাতালের বেড বরাদ্দ, জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অপারেশনের সিরিয়াল কিংবা অ্যাম্বুলেন্স সেবার ক্ষেত্রেও প্রকাশ্যেই অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হচ্ছে। এমনকি সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়ার জন্য ওয়ার্ডবয়ের হাতে টাকা না দিলে বেড পাওয়া যায় না, আর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ বেড পাওয়া তো এখন সাধারণ মানুষের জন্য সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের রেজিস্ট্রি অফিস, ভূমি অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়গুলোতে ঘুষ নেওয়া হচ্ছে এক প্রকার বুক ফুলিয়েই। জমির নামজারি, খতিয়ান সংশোধন কিংবা দলিল নিবন্ধনে নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়াও দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। জমি কেনাবেচা বা মিউটেশনের মতো কাজে ঘুষ ছাড়া ফাইল অনুমোদন পাওয়া যেন অলীক কল্পনা। তেজগাঁও ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে আসা খিলগাঁও এলাকার এক ভুক্তভোগী জানান, সরকারি ফি-র বাইরে তার কাছে বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়েছিল, পরবর্তীতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দেনদরবার করে উপরি টাকা দিয়েই তাকে নিজের জমির কাজ হাসিল করতে হয়েছে।

ঢাকার মিরবাগের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন তার ছেলের জন্মনিবন্ধন করার জন্য মহাখালী ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক অফিসে গিয়ে আবেদন করেন। সাধারণ নিয়মে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এই কাজ হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। পরে অফিসের বাইরে এক কম্পিউটার দোকানির সঙ্গে ১২০০ টাকার চুক্তি করার পর মাত্র এক দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধনটি হাতে পান। সেখানে সেবা নিতে আসা সুরাইয়া বেগম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘জন্ম থেকে শুরু করে মরার পরও যে এই দেশে মানুষের শান্তি নেই, তা এই অফিসে না আসলে বুঝতাম না। সামান্য একটা ভুলের জন্য তিন মাস ধরে ঘুরছি, শেষ পর্যন্ত দালালের হাতে বাড়তি টাকা দেওয়ার পরেই কাজটা হলো।’

এই চরম অব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নাগরিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই জঘন্য ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ করতে সরকারকে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যারা এই সব অনৈতিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের চাকরিচ্যুতিসহ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং একই সঙ্গে দেশের নাগরিকদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে আরও বলেন, এত বড় গণঅভ্যুত্থান ও পরিবর্তনের পরও যদি আমাদের সেই পুরাতন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার্থেই ফিরে যেতে হয়, তাহলে দেশের এত শত শহীদের আত্মত্যাগ সম্পূর্ণ বৃথা হয়ে যাবে।

এছাড়া বিআরটিএ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে হলে কিংবা নতুন গাড়ির নিবন্ধন নিতে হলে ঘুষ দেওয়াটা এখন একটি অলিখিত ও বাধ্যতামূলক নিয়মে পরিণত হয়েছে। একইভাবে বহুতল ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি কিংবা মিউটেশন করতে গেলেও নানা ধরনের কাগজের অজুহাতে গ্রাহকদের হয়রানি করা হচ্ছে। এই সব বড় সেবার বাইরেও গ্রামীণ জনপদে অবিবাহিত বা বিধবা সনদপত্র, ভূমিহীন ও দুস্থদের তালিকা প্রণয়ন, বয়স্ক ও অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার আবেদন, মুক্তিযোদ্ধা ভাতার আবেদন, ভিজিডি বা সরকারি চালের কার্ড সেবা এবং ক্ষুদ্র ঋণের সহায়তা পেতে গেলেও স্থানীয় প্রভাবশালী ও কর্মচারীদের ঘুষ দিতে হচ্ছে, যা দেশের সুশাসনকে এক চরম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল