কিউবার সাবেক শীর্ষ নেতা ও দেশটির বিপ্লবের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগনামা দাখিলের ঘটনায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিশ্বের দুই পরাশক্তি রাশিয়া এবং চীন। বেইজিং ও মস্কো উভয় পক্ষই মার্কিন আদালতের এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে কিউবার পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হাভানার কমিউনিস্ট সরকারকে কোণঠাসা করার জন্য ওয়াশিংটন যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হাতে নিয়েছে, এই আইনি পদক্ষেপ তারই ধারাবাহিকতা। তবে এবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের পারদ আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৯৬ সালের একটি বিতর্কিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওই বছর কিউবার আকাশসীমায় দুটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করার ঘটনা ঘটে, যাতে চারজন আরোহী নিহত হন। দীর্ঘদিন ধরে এই ঘটনাটি ওয়াশিংটন এবং হাভানার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও বৈরিতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী এবং নির্দেশদাতা হিসেবে কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করে একটি অভিযোগনামা প্রকাশ করে। এই আইনি পদক্ষেপের পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার ঝড় উঠেছে। বর্তমান মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই কিউবার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। এমনকি দেশটির কমিউনিস্ট সরকারের পতন ঘটানোর বিষয়েও বিভিন্ন সময় খোলামেলা ও স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক আইনি পদক্ষেপের পরপরই ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এর নিন্দা জানানো হয়। রাশিয়ার দীর্ঘদিনের মিত্র কিউবার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে ক্রেমলিনের প্রধান মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ রুশ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানান যে, কোনো স্বাধীন দেশের সাবেক বা বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানদের বিরুদ্ধে এমন কোনো বৈরি পদ্ধতি অবলম্বন করা মোটেও উচিত নয়, যা কার্যত প্রকাশ্য সহিংসতার রূপ নেয়। ওয়াশিংটনের এই ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগকে সম্পূর্ণ অসমর্থনযোগ্য এবং চরম আগ্রাসী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে মস্কো। রাশিয়ার পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা তাদের মিত্র দেশের ওপর এই ধরনের কোনো একতরফা আধিপত্য বিস্তার বরদাশ করবে না।
মস্কোর সুরে সুর মিলিয়ে বেইজিং থেকেও ওয়াশিংটনের প্রতি তীব্র হুঁশিয়ারি সংকেত পাঠানো হয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের এই কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি মার্কিন প্রশাসনকে কথায় কথায় শক্তির মহড়া দেওয়া এবং অন্য দেশের ওপর জোরজুলুম ও হুমকি-ধমকি বন্ধ করার আহ্বান জানান। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, চীন সবসময় কিউবার সার্বভৌমত্বের পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে এবং যেকোনো অজুহাতে বাইরের কোনো শক্তির অযাচিত চাপ সৃষ্টির চেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করে। চীনা মুখপাত্র মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগ কিংবা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোকে যেন অন্য কোনো স্বাধীন দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার বা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা না হয়।
এদিকে নিজের দেশের সাবেক নেতার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তিনি মার্কিন আদালতের এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট এবং একটি নোংরা রাজনৈতিক চালবাজি বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, কিউবার সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্যই এই ধরনের পুরনো ঘটনাকে নতুন করে সামনে আনা হচ্ছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দাবি করেছেন যে, রাউল কাস্ত্রো নিজেই একসময় ওই দুটি বিমান ভূপাতিত করার নির্দেশ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন। কিউবার বর্তমান শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো সামরিক বা শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নেবে কি না—এমন এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা একটি শান্তিপূর্ণ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চান। তবে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ সুরক্ষায় মার্কিন প্রশাসনের সামনে সব ধরনের পথই খোলা রয়েছে। সব মিলিয়ে রাউল কাস্ত্রোর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন, হাভানা, মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হলো।

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
কিউবার সাবেক শীর্ষ নেতা ও দেশটির বিপ্লবের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগনামা দাখিলের ঘটনায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিশ্বের দুই পরাশক্তি রাশিয়া এবং চীন। বেইজিং ও মস্কো উভয় পক্ষই মার্কিন আদালতের এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে কিউবার পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হাভানার কমিউনিস্ট সরকারকে কোণঠাসা করার জন্য ওয়াশিংটন যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হাতে নিয়েছে, এই আইনি পদক্ষেপ তারই ধারাবাহিকতা। তবে এবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের পারদ আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৯৬ সালের একটি বিতর্কিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওই বছর কিউবার আকাশসীমায় দুটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করার ঘটনা ঘটে, যাতে চারজন আরোহী নিহত হন। দীর্ঘদিন ধরে এই ঘটনাটি ওয়াশিংটন এবং হাভানার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও বৈরিতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী এবং নির্দেশদাতা হিসেবে কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করে একটি অভিযোগনামা প্রকাশ করে। এই আইনি পদক্ষেপের পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার ঝড় উঠেছে। বর্তমান মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই কিউবার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। এমনকি দেশটির কমিউনিস্ট সরকারের পতন ঘটানোর বিষয়েও বিভিন্ন সময় খোলামেলা ও স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক আইনি পদক্ষেপের পরপরই ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এর নিন্দা জানানো হয়। রাশিয়ার দীর্ঘদিনের মিত্র কিউবার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে ক্রেমলিনের প্রধান মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ রুশ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানান যে, কোনো স্বাধীন দেশের সাবেক বা বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানদের বিরুদ্ধে এমন কোনো বৈরি পদ্ধতি অবলম্বন করা মোটেও উচিত নয়, যা কার্যত প্রকাশ্য সহিংসতার রূপ নেয়। ওয়াশিংটনের এই ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগকে সম্পূর্ণ অসমর্থনযোগ্য এবং চরম আগ্রাসী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে মস্কো। রাশিয়ার পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা তাদের মিত্র দেশের ওপর এই ধরনের কোনো একতরফা আধিপত্য বিস্তার বরদাশ করবে না।
মস্কোর সুরে সুর মিলিয়ে বেইজিং থেকেও ওয়াশিংটনের প্রতি তীব্র হুঁশিয়ারি সংকেত পাঠানো হয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের এই কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি মার্কিন প্রশাসনকে কথায় কথায় শক্তির মহড়া দেওয়া এবং অন্য দেশের ওপর জোরজুলুম ও হুমকি-ধমকি বন্ধ করার আহ্বান জানান। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, চীন সবসময় কিউবার সার্বভৌমত্বের পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে এবং যেকোনো অজুহাতে বাইরের কোনো শক্তির অযাচিত চাপ সৃষ্টির চেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করে। চীনা মুখপাত্র মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগ কিংবা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোকে যেন অন্য কোনো স্বাধীন দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার বা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা না হয়।
এদিকে নিজের দেশের সাবেক নেতার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তিনি মার্কিন আদালতের এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট এবং একটি নোংরা রাজনৈতিক চালবাজি বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, কিউবার সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্যই এই ধরনের পুরনো ঘটনাকে নতুন করে সামনে আনা হচ্ছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দাবি করেছেন যে, রাউল কাস্ত্রো নিজেই একসময় ওই দুটি বিমান ভূপাতিত করার নির্দেশ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন। কিউবার বর্তমান শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো সামরিক বা শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নেবে কি না—এমন এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা একটি শান্তিপূর্ণ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চান। তবে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ সুরক্ষায় মার্কিন প্রশাসনের সামনে সব ধরনের পথই খোলা রয়েছে। সব মিলিয়ে রাউল কাস্ত্রোর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন, হাভানা, মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হলো।

আপনার মতামত লিখুন