দিকপাল

শিল্পে প্রাণ ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মহাপরিকল্পনা, অগ্রাধিকার পাবে ক্ষতিগ্রস্ত খাত


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬ | ১০:৪০ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

শিল্পে প্রাণ ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মহাপরিকল্পনা, অগ্রাধিকার পাবে ক্ষতিগ্রস্ত খাত

দেশের স্থবির হয়ে পড়া শিল্প খাতে প্রাণসঞ্চার করতে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে এক বিশাল কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১ হাজার ২০০-এর বেশি বন্ধ কারখানা চালু করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর প্রাথমিক ধাপ হিসেবে শুরুতে ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল রিফাইন্যান্স স্কিম বা পুনরর্থায়ন তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পাওয়ার পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সার্কুলার জারি করা হবে।

প্রস্তাবিত এই ৪০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের বণ্টন কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বড় শিল্প খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (CMSME) খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি এবং কৃষি খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অর্থ মূলত কারখানাগুলোর চলতি মূলধন হিসেবে দেওয়া হবে, যার মেয়াদ হবে এক থেকে দেড় বছর। এই বিশেষ আর্থিক সুবিধার মূল উদ্দেশ্য হলো, দীর্ঘকাল বন্ধ থাকার ফলে অকেজো হয়ে পড়া ক্যাপিটাল মেশিনারি বা মূলধনী যন্ত্রপাতি মেরামত করে কারখানাগুলোকে দ্রুত উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা। তবে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি; প্রাথমিকভাবে স্বল্পমেয়াদি এই উদ্যোগের সাফল্য পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, সরকার এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে নিবিড় আলোচনা চলছে এবং ইতোমধ্যে বন্ধ কারখানার তালিকা সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে।

এই বিশাল তহবিলের উৎস নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহলে বর্তমানে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। ব্যাংকগুলোর বর্তমান তারল্য সংকট বিবেচনায় নিয়ে ধারণা করা হচ্ছে, এই অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংককেই সরবরাহ করতে হবে। তবে নতুন টাকা ছাপিয়ে এই তহবিল গঠন করা হলে বাজারে মুদ্র সরবরাহ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দেওয়ার একটি আশঙ্কা থেকে যায়। ঋণের সুদহারের ক্ষেত্রেও একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক; ধারণা করা হচ্ছে, ঋণের সুদহার বর্তমান মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কিছুটা বেশি হলেও পলিসি রেটের নিচে বা ৯ শতাংশের আশেপাশে থাকবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও অর্থায়নের উৎস নিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, শুধুমাত্র নতুন টাকা না ছাপিয়ে ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলো থেকে আংশিক ফান্ড সংগ্রহ এবং আগামী জাতীয় বাজেটে এ খাতের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।

তবে এই সুবিধা ঢালাওভাবে সব বন্ধ কারখানার জন্য উন্মুক্ত থাকছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক স্পষ্ট করেছেন যে, শুধুমাত্র সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই এই তহবিলের আওতায় আসবে যারা কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা ডলার বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ করে যাদের হাতে বর্তমানে নতুন ক্রয়াদেশ রয়েছে এবং বাজারে পণ্যের চাহিদা আছে, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ১০০ কোটি টাকার বেশি ও কম ঋণ রয়েছে এমন কারখানার বিস্তারিত তথ্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬


শিল্পে প্রাণ ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মহাপরিকল্পনা, অগ্রাধিকার পাবে ক্ষতিগ্রস্ত খাত

প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬

featured Image

দেশের স্থবির হয়ে পড়া শিল্প খাতে প্রাণসঞ্চার করতে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে এক বিশাল কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১ হাজার ২০০-এর বেশি বন্ধ কারখানা চালু করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর প্রাথমিক ধাপ হিসেবে শুরুতে ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল রিফাইন্যান্স স্কিম বা পুনরর্থায়ন তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পাওয়ার পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সার্কুলার জারি করা হবে।

প্রস্তাবিত এই ৪০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের বণ্টন কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বড় শিল্প খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (CMSME) খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি এবং কৃষি খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অর্থ মূলত কারখানাগুলোর চলতি মূলধন হিসেবে দেওয়া হবে, যার মেয়াদ হবে এক থেকে দেড় বছর। এই বিশেষ আর্থিক সুবিধার মূল উদ্দেশ্য হলো, দীর্ঘকাল বন্ধ থাকার ফলে অকেজো হয়ে পড়া ক্যাপিটাল মেশিনারি বা মূলধনী যন্ত্রপাতি মেরামত করে কারখানাগুলোকে দ্রুত উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা। তবে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি; প্রাথমিকভাবে স্বল্পমেয়াদি এই উদ্যোগের সাফল্য পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, সরকার এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে নিবিড় আলোচনা চলছে এবং ইতোমধ্যে বন্ধ কারখানার তালিকা সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে।

এই বিশাল তহবিলের উৎস নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহলে বর্তমানে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। ব্যাংকগুলোর বর্তমান তারল্য সংকট বিবেচনায় নিয়ে ধারণা করা হচ্ছে, এই অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংককেই সরবরাহ করতে হবে। তবে নতুন টাকা ছাপিয়ে এই তহবিল গঠন করা হলে বাজারে মুদ্র সরবরাহ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দেওয়ার একটি আশঙ্কা থেকে যায়। ঋণের সুদহারের ক্ষেত্রেও একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক; ধারণা করা হচ্ছে, ঋণের সুদহার বর্তমান মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কিছুটা বেশি হলেও পলিসি রেটের নিচে বা ৯ শতাংশের আশেপাশে থাকবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও অর্থায়নের উৎস নিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, শুধুমাত্র নতুন টাকা না ছাপিয়ে ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলো থেকে আংশিক ফান্ড সংগ্রহ এবং আগামী জাতীয় বাজেটে এ খাতের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।

তবে এই সুবিধা ঢালাওভাবে সব বন্ধ কারখানার জন্য উন্মুক্ত থাকছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক স্পষ্ট করেছেন যে, শুধুমাত্র সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই এই তহবিলের আওতায় আসবে যারা কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা ডলার বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ করে যাদের হাতে বর্তমানে নতুন ক্রয়াদেশ রয়েছে এবং বাজারে পণ্যের চাহিদা আছে, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ১০০ কোটি টাকার বেশি ও কম ঋণ রয়েছে এমন কারখানার বিস্তারিত তথ্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল