দিকপাল

রাজপথের সন্ত্রাসীদের চেয়েও ভয়ংকর সাইবার অপরাধী জিম্মি হচ্ছে সাধারণ মানুষ


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬ | ০৪:২১ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

রাজপথের সন্ত্রাসীদের চেয়েও ভয়ংকর সাইবার অপরাধী জিম্মি হচ্ছে সাধারণ মানুষ

এক সময় আন্ডারওয়ার্ল্ড বা অন্ধকার জগতের অপরাধীদের দাপটে থমকে যেত জনপদ। সেই জগতের নিয়ন্ত্রণ থাকত পেশাদার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হাতে, যারা কেবল অপরাধ জগৎই নয়, বরং দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করত। ব্যবসায়ীরা প্রাণভয়ে তাদের চাঁদা দিতেন, অনেকে আবার নিরাপদে ব্যবসা করার জন্য তাদের সাথে আপস করতে বাধ্য হতেন। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে অপরাধের সেই পুরোনো ধরণ বদলে গেছে। রাজপথের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের সেই জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে সাইবার অপরাধীরা। বর্তমান বিশ্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের চেয়েও বহুগুণ বেশি ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে সাইবারওয়ার্ল্ড, যেখানে অপরাধীরা অদৃশ্য থেকে জননিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া আজ মানুষের সামাজিক সুরক্ষার প্রধান শত্রু ও এক নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

আগেকার দিনে প্রতিপক্ষকে দমনে ভাড়াটে মস্তান বা শারীরিক শক্তি ব্যবহার করা হতো, কিন্তু এখন তার চেয়েও কার্যকর হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে সাইবার সন্ত্রাস। বর্তমানে কাউকে হেনস্তা করতে অ্যাসিড নিক্ষেপের মতো ঘটনার চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে ফেসবুক বা ইউটিউবে কুৎসিত আক্রমণ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী নারী ও কিশোরীদের বিশাল এক অংশ নিয়মিত সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে সাইবার বুলিংয়ের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে ১২৭ জন নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। অথচ ডিজিটাল এই গুজব ও মিথ্যাচারের হোতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই নয়, সাইবার অপরাধীদের বড় একটি অংশ এখন দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতের ওপর আঘাত হানছে। একদল সংঘবদ্ধ চক্র শিল্পপতি ও উদ্যোক্তাদের টার্গেট করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে এবং চাহিদা পূরণ না হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অপপ্রচার চালিয়ে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করছে।

সাইবার অপরাধীদের এই বেপরোয়া আচরণের সামনে আজ রাষ্ট্র ও সমাজ যেন এক প্রকার অসহায়। অতীতে যেমন অপরাধ জগতের সাথে হাত মিলিয়ে জীবন রক্ষা করতে হতো, এখন অনেক সাহসী উদ্যোক্তাও মানসম্মান রক্ষায় সাইবার সন্ত্রাসীদের সাথে আপস করতে বাধ্য হচ্ছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের আইন-আদালত থাকলেও সাইবার অপরাধীরা যেন প্রায় সব ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও, সেই অধিকার কখনোই অন্যের সম্মানহানি বা সমাজকে অস্থিতিশীল করার অনুমতি দেয় না। ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস এবং ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসের মতো আন্তর্জাতিক দলিলগুলোতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মত প্রকাশের অধিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদি কোনো বক্তব্য কারও সুনাম নষ্ট করে বা সমাজে ঘৃণা ছড়ায়, তবে তা কখনোই স্বাধীন মত প্রকাশ হিসেবে গণ্য হতে পারে না।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট' এবং জার্মানির 'নেটওয়ার্ক এনফোর্সমেন্ট অ্যাক্ট' উল্লেখযোগ্য। এসব আইনে বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করা হয়েছে যাতে তারা ভুয়া তথ্য ও ঘৃণামূলক বক্তব্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে নেয়, অন্যথায় তাদের বিশাল অংকের জরিমানা গুনতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ দমনে বর্তমানে কার্যকর কোনো শক্তিশালী আইনের অভাব থাকায় দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষ আজ সোশ্যাল মিডিয়ার কাছে এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাজপথের আন্ডারওয়ার্ল্ড দমনে কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি যদি এখনই সাইবার অপরাধ দমনে একটি আধুনিক ও বলিষ্ঠ আইন প্রণয়ন করা না হয়, তবে এই নিয়ন্ত্রনহীন ডিজিটাল জগৎ কেবল সাধারণ মানুষের জন্যই নয়, বরং খোদ রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬


রাজপথের সন্ত্রাসীদের চেয়েও ভয়ংকর সাইবার অপরাধী জিম্মি হচ্ছে সাধারণ মানুষ

প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬

featured Image

এক সময় আন্ডারওয়ার্ল্ড বা অন্ধকার জগতের অপরাধীদের দাপটে থমকে যেত জনপদ। সেই জগতের নিয়ন্ত্রণ থাকত পেশাদার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হাতে, যারা কেবল অপরাধ জগৎই নয়, বরং দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করত। ব্যবসায়ীরা প্রাণভয়ে তাদের চাঁদা দিতেন, অনেকে আবার নিরাপদে ব্যবসা করার জন্য তাদের সাথে আপস করতে বাধ্য হতেন। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে অপরাধের সেই পুরোনো ধরণ বদলে গেছে। রাজপথের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের সেই জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে সাইবার অপরাধীরা। বর্তমান বিশ্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের চেয়েও বহুগুণ বেশি ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে সাইবারওয়ার্ল্ড, যেখানে অপরাধীরা অদৃশ্য থেকে জননিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া আজ মানুষের সামাজিক সুরক্ষার প্রধান শত্রু ও এক নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

আগেকার দিনে প্রতিপক্ষকে দমনে ভাড়াটে মস্তান বা শারীরিক শক্তি ব্যবহার করা হতো, কিন্তু এখন তার চেয়েও কার্যকর হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে সাইবার সন্ত্রাস। বর্তমানে কাউকে হেনস্তা করতে অ্যাসিড নিক্ষেপের মতো ঘটনার চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে ফেসবুক বা ইউটিউবে কুৎসিত আক্রমণ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী নারী ও কিশোরীদের বিশাল এক অংশ নিয়মিত সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে সাইবার বুলিংয়ের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে ১২৭ জন নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। অথচ ডিজিটাল এই গুজব ও মিথ্যাচারের হোতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই নয়, সাইবার অপরাধীদের বড় একটি অংশ এখন দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতের ওপর আঘাত হানছে। একদল সংঘবদ্ধ চক্র শিল্পপতি ও উদ্যোক্তাদের টার্গেট করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে এবং চাহিদা পূরণ না হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অপপ্রচার চালিয়ে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করছে।

সাইবার অপরাধীদের এই বেপরোয়া আচরণের সামনে আজ রাষ্ট্র ও সমাজ যেন এক প্রকার অসহায়। অতীতে যেমন অপরাধ জগতের সাথে হাত মিলিয়ে জীবন রক্ষা করতে হতো, এখন অনেক সাহসী উদ্যোক্তাও মানসম্মান রক্ষায় সাইবার সন্ত্রাসীদের সাথে আপস করতে বাধ্য হচ্ছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের আইন-আদালত থাকলেও সাইবার অপরাধীরা যেন প্রায় সব ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও, সেই অধিকার কখনোই অন্যের সম্মানহানি বা সমাজকে অস্থিতিশীল করার অনুমতি দেয় না। ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস এবং ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসের মতো আন্তর্জাতিক দলিলগুলোতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মত প্রকাশের অধিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদি কোনো বক্তব্য কারও সুনাম নষ্ট করে বা সমাজে ঘৃণা ছড়ায়, তবে তা কখনোই স্বাধীন মত প্রকাশ হিসেবে গণ্য হতে পারে না।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট' এবং জার্মানির 'নেটওয়ার্ক এনফোর্সমেন্ট অ্যাক্ট' উল্লেখযোগ্য। এসব আইনে বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করা হয়েছে যাতে তারা ভুয়া তথ্য ও ঘৃণামূলক বক্তব্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে নেয়, অন্যথায় তাদের বিশাল অংকের জরিমানা গুনতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ দমনে বর্তমানে কার্যকর কোনো শক্তিশালী আইনের অভাব থাকায় দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষ আজ সোশ্যাল মিডিয়ার কাছে এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাজপথের আন্ডারওয়ার্ল্ড দমনে কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি যদি এখনই সাইবার অপরাধ দমনে একটি আধুনিক ও বলিষ্ঠ আইন প্রণয়ন করা না হয়, তবে এই নিয়ন্ত্রনহীন ডিজিটাল জগৎ কেবল সাধারণ মানুষের জন্যই নয়, বরং খোদ রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল